মা তোমার জন্য আমার কোনো
দুঃখ নেই জানি
কোনো দিন মনেও পরে না যে
তুমি বলে বা মা বলে
কেউ একজন ছিল আমার কোনো
কালেও। তুমি কিংবা মা
থাকলে আমার জীবনের তেমন
কোনো হেরফের হয়ে যেতো
সেরকমও ভাবি না কখনো। তবু
যখন খুব বেশী একা লাগে
অর্থহীন পরমার্থ জীবনের
মুট টানতে টানতে হাঁপিয়ে উঠি-
ভাবি একটা আশ্রয় হলে কি
ভালো হত কিছু? তোমার বুকে
ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদে কেটে কি
জুড়াতো এই পাথর বুক?
তুমি যদি ইশ্বরের কাছে
গিয়ে থাক তাহলে তো জানই যে
আমার ইশ্বরও নেই তুমিও
নেই, ঘরও নেই একান্ত আড়ালও নেই।
আম্মা, মা আমার মা মাগো
তুমি জানো তোমাকে এমন করে
কোনোদিন ডাকিনি আমি
তবু মানুষের কাছে শুনে
শুনে কিযে লোভ হয়
তাই আনাড়ির মত খুবই নীচু
স্বরে মাঝে মাঝে ডেকে উঠি।
তোমার গর্ভে যেহেতু
জন্মেছি নিশ্চয় তোমাকে দেখেছি আমি
দুই বছর হউক কিংবা তিন,
বেঁচে যেহেতু ছিলাম তোমার সঙ্গে একসাথে
নিশ্চয় তোমার দুধও খেয়েছি।
অথচ দেখ তোমাকে ডাকার লজ্জা
তোমাকে ছুঁয়ে দেখার লজ্জা
তোমার জন্যে হাউমাউ করে কাঁদার লজ্জা
আমার কিছুতেই যায় না।
প্রায় অস্পষ্ট একটা ছবি
থেকে তোমার একটা পোরট্রেট করিয়ে
এনেছিলেন বড় ভাই। আমি দূর থেকে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখেছি
তোমাকে এমন আপন কেউ মনে
হয়নি আমার, কতবার ভেবেছি
ছবি হলেও তোমাকে একটু
ছুঁয়ে দেই, একটু জড়িয়ে ধরি। তবু
কি অন্তহীন লজ্জা আমাকে
ঘিরে ধরে চারপাশ, আমার অবশ চোখ কেবল
তাকিয়ে থেকেছে অপলক তোমার
দিকে। এখন তোমার ছবিটিও দেখিনা আর।
তুমি তো জান নিশ্চয় যে তোমার
ছবিটাও দেখার সুযোগ নেই আর
আমার যারা আপন কিংবা তোমার
রক্তের উত্তরাধিকার যারা বহন করছে
তাদের কারো সাথেই তেমন স্বাভাবিক
সম্পর্ক ও নেই আমার। বৃদ্ধ বাবা
সারারাত নিদ্রাহীন কাটিয়ে
সকালবেলা খুব করে চান আমি অন্তত তাঁর
মাথার কাছে বসে থাকি,
মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। জ্বরতপ্ত কপালে জলপট্টি
না হউক আমার শীতল হাত
অন্তত কিছুটা জুড়াক তাঁর উত্তাপ।
আর সবার মত তুমিও নিশ্চয়
জান না যে আমিও কি ভীষনভাবে চাই-
কি ভীষন ভাবে চাই আমার
আত্বজ আর আত্বজাদের সাথে আমিও সবার মত
স্বাভাবিক থাকি। ছেলেবেলার
কথা বলতে বলতে আমাদের রাত ভোর হয়ে যাক
ছেলেবেলার হাসিগুলো হাসির
হিল্লোল তুলুক মাঝরাতেও। কিন্তু আমার হয় না-
আমি পারি না, কি এক অচেনা
হুতোম পেঁচা যেন কুয়াশার চাদর টেনে দিয়েছে
আমাদের মধ্যে।
সবার মত আমিও জানি এসবের দায় নিশ্চিত ভাবেই আমার।
কোনো কৈফিয়ত নেই। আমার ভালবাসার হাত কেবলি গুটিয়ে আসে
আমি প্রাণপন চেষ্টা করতে থাকি প্রসারিত করতে, অন্তত
আমার সন্তানেরা বেড়ে উঠুক ভালবাসায়। তবু ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে করে
ভীষণ ক্লান্ত লাগে, ঘুম পায়। মাঝে মাঝে ভেতরের কোনো বেঁচে যাওয়া দ্রোহ
আঙুল তোলে তোমার দিকে, যুবক বাবার দিকে, বেড়ে উঠা শৈশবের দিকে
কিংবা ভেজা ভোরে নগ্ন শরীরে জানালায় তাকিয়ে থাকা বালকের অনন্ত দৃষ্টির দিকে।
‘শুকনা বড়ই কাঁটা চিকিৎসায়’ লাল হয়ে যাওয়া নগ্ন পশ্চাতদেশের
ব্যাথা ভুলতে আমি যখন জানালা দিয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকতাম আবছা অন্ধকারে
তখন আমাদের প্রাইমারী স্কুলের জাম গাছের মাথা ছুঁয়ে
সাদা কাপড়ে জড়ানো একটা নারী চেয়ে থাকতো আমার দিকে
সেটা কি ভূত ছিল নাকি তুমি? ভূত দেখে কি মানুষ ভয় পায়?
সাদা কাপড়ে জড়ানো ওই ভূত দেখে আমার একদম ভয় হতো না
ভূতের দৃষ্টি ছিল আমারই মত কুয়াশাচ্ছন্ন।
তোমার আদরের ভাইপো তার
প্রিয় ফুপুর কবর জিয়ারত করতে চাইলে
আমিও তার সঙ্গী হই, যদিও
কবরে গিয়ে তোমার জন্যে প্রার্থনা করার কথা
কখনই মনে হয়নি আমার। জানি,
তুমি এই মাটিতে শুয়ে আছ বলেই
গোটা বাংলাদেশকেই মা বলে
মনে হয়। তোমাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট
সইতে না পেরে পায়ে ঠেলেছি
বিলাসী জীবন, তবু চুপি চুপি তোমার সঙ্গে দেখা
করতে যাওয়ার লজ্জা, লুকিয়ে
তোমাকে জড়িয়ে থাকার লজ্জা যে আমার
কিছুতেই যায় না।
আমার অক্ষমতার দায় আমি
কাকে দেব
বয়ঃসন্ধির না পাওয়া আমাকে
নুইয়ে রাখে খালপাড়ের জংলা গাছের মত
আহ আমার চোখে মুখে একটু জল
ছিটিয়ে দাও মা
আমার হাত কেবলি গুটিয়ে আসে
আমার আংটিবিহীন পান্ডুর
হাতে ছুঁয়ে রাখো তোমার অশরীরী হাত
১১.০৫.২০১৪