Saturday, October 24, 2020

ক্রোধ

সম্ভবত আমি নিজেকে চালাতে ব্যর্থ হচ্ছি, সহজেই
হারিয়ে ফেলছি নিজেরই অধিকার।
কালরাতে বন্ধুর পাঁচতারা হোটেলের মত বাড়ির সবুজ ঘাসে বসে থেকে
আকাশের একটা তারাও আমার পরিচিত মনে হয়নি
একটা মেঘও আমার জন্যে থামেনি এক মুহূর্ত। ঘূর্ণনরত
রীতিসিদ্ধ জল ছুঁতে গেলে আমার হাত সাড়া দেয়নি আমার ইচ্ছায়
 
আপনি সম্ভবত আমার ক্রোধের ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না,
ভুলতেও। আমি নিজেই বুঝতে পারছি না… আপনাকে আর কী বলি!
ইদানীং কোনো অপরাধবোধেও আর তাড়িত হই না। আসুন
পৃথিবীর সকল নীতিবাক্যের বই আমরা পুড়িয়ে ফেলি
 
অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে, আমি, ভবিষ্যতহীন আমি
আমার রোমকূপ শক্ত হয়ে যাওয়া ক্রোধান্ধ হাত বাড়িয়ে রাখি
শীতলতার আশায়
 
মোল্লাবাড়ির ঘাটে গোছলের সময় আশ্চর্যজনক ভাবেই
আমরা আমাদের সময় থামিয়ে রাখতে পারতাম। মেরামতের জন্য
উল্টো করে রাখা নৌকায় শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে আমাদের সাথে
দাঁড়িয়ে থাকত শীতের দুপুর
 
হায় স্বেচ্ছাচারিতা!
 
কবিতার মত স্বেচ্ছাচারী জীবন আপনাকে ভাবিয়ে তুলছে না?
 
২২.১০.২০২০

Thursday, October 15, 2020

মেক্সিকান কবি ওক্টাভিও পাজ (Octavio Paz Lozano) এর ‘Last Dawn’ কবিতার ভাবানুবাদ

 
তোমার চুল অরণ্যে হারিয়ে যায়
তোমার পা ছুঁয়ে থাকে আমার পা
ঘুমিয়ে থাকলে তুমি রাত্রির চেয়ে বড় হয়ে যাও
তবু তোমার স্বপ্নগুলো এই ঘরেরই মাপে
 
এই সামান্য আমরা এর বেশি আর কী পারি?
বাইরে একটা ট্যাক্সি যাচ্ছে
তার যাত্রীরা অশরীরী
যে নদীটা বয়ে যাচ্ছে
সে সবসময়
           পিছেই ছুটছে
 
আগামীকাল কি একটা অন্য দিন হবে?
 
১৬.১০.২০২০

Sunday, October 11, 2020

মাছরাঙ্গা

অনেকদিন পর প্রেমিকার দুঃখের মত দুঃখ পেয়ে
সারারাত ঘুম হল না
অনেকদিন পর প্রেমিকার মুখের মত মুখ মনে পড়ে
সারারাত ঘুম হল না
অনেকদিন পর
পাট ভেজানো জলের গন্ধের মত গন্ধ গায়ে মেখে
সারারাত শিশিরে ভিজেছি
 
আমাকে খুঁড়ে দেখবে বলে একটা মাছরাঙ্গা
ধার দিচ্ছিল তার ঠোঁটে, কী আশ্চর্য
আমি তার রঙিন ঠোঁটের প্রেমে পড়ে গেছি
 
রক্তাক্ত হব বলে আমি বাড়িয়ে রেখেছি আমার ঠোঁট

Friday, October 9, 2020

আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি

আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
এইখানে অবিরত ঝরে পাতা, আমি আলগোছে হাঁটি
বসি একটা শান্ত নদীর ধারে। ঝুমঝুম বেদনা
কুমকুম জল। তুমি আছ
তুমি নাই। কে হাঁটে ছলছল।
 
আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
 
বেদনার মত মৃত্তিকা, মৃত্তিকার মত বেদনা
আমি তুলে আনি জল
জলে ও জঙ্গলে বেদনা বিহ্বল।
আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
 
ও পাখি তুমি গাও
ও জল তুমি নাও
বেদনা বিধুর আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
আমি ডুবি, আমি ভাসি
কে দাঁড়ায় ওপারে, কে খোলে আগল
 
আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
 
১০.১০.২০২০

প্রলোভন

ফিরে যাচ্ছি। উপরে উন্নয়নের মত প্রগলভ হয়ে
তৈরি হয়েছে ব্রিজ। ওয়াই এর মত ঠ্যাং
ছড়িয়ে বসত গেড়েছে নদীর মধ্যখানে। এই তিতাসের মৃত্যুও আসন্ন প্রায়!
 
আম্মার কবর চেনা যায় না, ঝোপঝাড়, গর্ত, পানি
আমার স্মৃতির মত দুর্গম। তবু দাঁড়িয়ে ছিলাম
স্মৃতিহীন, যেন আমি শূন্যতার উপাসক
 
আব্বার কবর নতুন। একটু উঁচুতে, হেঁটে উঠে
যাওয়া যায় সহজে। আছে বোনের কবর, দাদার…দাদীর
নতুন মৃত্যু পুরোনো মৃত্যুকে ভুলিয়ে দেয় সহজেই।
মৃত্যুর এই বিশেষত্ব, জন্ম থেকে আলাদা
 
এই গ্রামে এখন আর আমাদের বসত নাই, কেবল
মৃত-আমাদের বসত। এবং আব্বার পরে সেই বসতও অনিশ্চিত।
 
ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া খুশির দৌড়ে
যে রাস্তা থেকে পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম অন্তত বিশ ফুট নিচে
সেইসব এখন সমতল, পাকা।
আমাদের বিশাল পুকুরও ভরাট হয়ে গেছে নদীর চিকচিকে বালিতে
 
নাইম কাক্কু আমাদের দেখাচ্ছিলেন সেই ভরাট হওয়া পুকুরের সমতল
পারে এখনো কিছু গাছ, কাচ মিঠা, ফজলি, জাম, তেঁতুল, বাঁশঝাড়,
আর কোনায় পারিবারিক কবরের জায়গাটায় একটা মাটির ঢিবি।
নাইম কাক্কু তাঁর অশরীরী হাত প্রায় বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে বললেন
‘এখানে যেখানে ইচ্ছা তোমাদের বাড়ি বানাতে পার’, বলে তাকাচ্ছিলেন
আমাদের সন্তানদের দিকে, স্ত্রীদের দিকে, বোনদের স্বামীদের দিকে
 
শেষমেশ আমার দিকে। জানি এটা তাঁর, তাঁদের বদান্যতা
আব্বা আগেই সব বেচে-টেচে সম্পর্কের ইতি টেনেছেন ভূরভূরিয়ার সাথে।
তবু এই প্রলোভনের বুদ্বুদ আমাকে নাড়িয়ে দেয় হঠাৎ করেই
 
চলে যাচ্ছি। সন্ধ্যার শান্ত লালিমা সখ্য গড়েছে আকাশ আর নদীতে
সামনের বাঁক পেরুলেই দৃষ্টিসীমারও বাইরে চলে যাবে আম্মার কবর
 
তবু আম্মার পাশে ঘুমাবার একটা প্রলোভনের বুদ্বুদ
ফুটতেই থাকে আমার ভেতরে
 
০৯.১০.২০২০