Sunday, September 29, 2013

সনাক্তকারী চিহ্ন 'বুকের বাম পাশে কালো তিল আছে'


আমাকে নগ্ন দেখে তুমি যদি চলেও যাও
কি আসে যায়। নগ্নতাই আমার বৈভব
নগ্নতা আমি ঢাকি না সুতো কিংবা চাতুর্যে
বরং উন্মুক্ত করি নিপতিত কিংবা উত্তুঙ্গ।
আমাকে উন্মুক্ত দেখে যদি তোমার বিবমিষা জাগে
জাগুক, কি আসে যায়।

আমার দাদা কৃষক ছিলেন
তার সুঠাম বাহু ছিল, ছিল ছাতিম গাছের মত বুকের পাটা
যদিও আমি তাকে দেখেছি বলে মনেই পড়ে না।
বাবা ছিলেন দরিদ্র শিক্ষক, যাকে ঠিকঠাক
ছা-পোষা বলা যায় কিনা সেটিও ভাববার। তিনি নিতান্তই
ক্ষীণকায় ছিলেন। দুই পক্ষের ছয় সন্তানকে মানুষ করতে কিংবা বাঁচিয়ে
রাখতেই তিনি আরো ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিলেন কিনা কে জানে

সপ্তম শ্রেণিতে উঠার সময় কোটবাড়ির সামরিক কলেজটি
আমাকে সনাক্তকারী চিহ্ন হিসেবে ‘বুকের বাম পাশে কালো তিল আছে”
বলে আইডি কার্ডে রায় দিয়েছিল। সেই কালো তিল
একই সাথে চারটি কালো তিলের খোঁজও যদি চাও
খুঁজতে হবে আমাকে নিরাভরণ।

তোমাকে দেখানোর কি আছে আমার নগ্নতা ছাড়া
আমার গায়ে যে   রঙ চঙ শার্ট দেখ, জিন্স আর ভারী জুতা
কখনো চটি জুতোয় হাঁটুতে আটকে যাওয়া পাঞ্জাবি,
ফেসবুক আর টুইটারে ঘন ঘন বদলে যাওয়া প্রফাইল ছবি
ঝলমলে আমি আর আরো ঝলমলে আমার বন্ধুরা; এসবের কোথাও
আমাকে পাবে না
বরং আবরনহীন আমাকে দেখো তুমি সরল
অকপট ঋজু।

বাইরে যতই চুলে পাক ধরুক
ভোগ আর সম্ভোগে বাড়ুক অস্থিরতার চর্বি
ভেতরে ভেতরে এখনও সেই দশ বছর বয়সের আমি
ঘর্ষণে ঘর্ষণে ক্ষয়ে যাওয়া হাফপ্যান্টে উকি দেয় উপবাসী নিতম্ব
নগ্নতা ছাড়া কোথাও খুঁজে পাবে না তুমি আমাকে অকৃত্রিম।

জড়াতেই যদি চাও তবে এসো
আমাকে জড়াও আলিঙ্গনে। ঢোলভাঙ্গার মীনেরা
যদিও আমার সঙ্গী  ছিল একদা
তবু দেখো কেমন আঁশহীন নিভাঁজ ত্বক
ভল্লুকেরা কখনোই বাসা বাঁধেনি আমার বুকে। মসৃনতায় যদি সুখ
না হয় তোমার, কি আসে যায়।

যদি পেতেই চাও আমাকে
আমার নগ্নতা খুঁড়ে ঢুকে যাও গভীরে আরও
দেখো শ্যাওলা পড়া একাকী ঘাট। শ্যাওলা পছন্দ নয় বলে
নারীরা পাল উড়িয়ে চলে গেছে দূরে।
পিছলে পড়ার ভয় নিয়েও যদি তুমি বসতে চাও ঘাটে
তবেই আমাকে পাবে তুমি নিবিড়। 


২৯.০৯.২০১৩



Thursday, September 12, 2013

আমার রোদ

আমার পাঁচ বছরের মেয়ে রোদ ; বলে বাবা
সিলেট থেকে এসে আমাকে একটা ছোট্ট ছাতা কিনে দিও।
এইবার যে বৃষ্টি প্রায় শেষ এটি ওকে কিছুতেই বোঝানো যায় না

আমি বলি ঘরে তো তিনটি ছাতা আছে, কিন্তু ওর ছোট্ট ছাতা চাই ই।
বলি আচ্ছা দেবো কিনে। তবু ও কথা থামাতেই চায় না
বলে যদি অনেক পয়সা লাগে কিনতে, আমি বলি দেবো
বলে যদি আরো অনেক পয়সা লাগে, আমি বলি দেবো
ও বলে, যদি আরো অনেক অনেক পয়সা লাগে, আমি বলি দেবো
যদি তোমার কাছে অত পয়সা না থাকে
বলি তাহলে সোফা টিভি বিক্রি করে তোমাকে ছাতা কিনে দেবো
ও বলে, যদি তাতেও না হয়। আমি বলি তাহলে সব বেচে দেবো
যা আছে আমার, তবু তোমাকে ছাতা কিনে দেবই।
ও যেনো আশ্বস্ত হয়, মিষ্টি করে হাসে

যে রাতে আমি সিলেট থেকে ঘরে ফিরব
ও কিছুতেই ঘুমাতে চায় না। আমি গাড়িতে চড়ার সময় থেকেই
ওর সময় গননা শুরু; বাবা এখন কোথায়? বলি ব্রাম্মনবাড়িয়া
ও খুবই হতাশ, ব্রাম্মনবাড়িয়া থেকে আসার সময় একবার গভীর রাত
হয়ে যাওয়ায় ট্রেনের দ্যোদুল্যমান পুলকও ওকে জাগিয়ে রাখতে পারেনি।
রাত বাড়ে, আমি পার হই মোহময়ী ভৈরব, নরসিংদী পেরিয়ে মাধবদী
তারপর ভুলতা এসে আমার গাড়ি অবস্থান ধর্মঘটে বসে। মেয়ের হতাশ
স্বরে আমার রক্তচাপ বাড়ে, ওকে ঘুমিয়ে পড়তে বলি। ও কিছুতেই ঘুমাবে না।
অতঃপর মধ্যরাত কাছাকাছি এলে গাড়ি যাত্রাবাড়ি এসে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে;
ড্রাইভারের নাক-ডাকা কানে এলে আমি চৌদ্দদিনের জঞ্জালের ভারী ব্যাগ সহ
নেমে পড়ি। আমার মেয়ের ঘুমজড়ানো গলা কানে বাজে
ওর মা ওকে ঘুমিয়ে যেতে বলে। বলে কাল সকালেই তো বাবাকে দেখতে পাবে
ও কিছুতেই ঘুমাবে না, ‘আজ দেখলেতো বাবাকে একদিন বেশী দেখা হবে’

ভারী ব্যাগ নিয়ে আমি যাত্রাবাড়ীর খানাখন্দ পার হতে থাকি জোড় কদমে
জীবনভর আমার অপ্রাপ্তির হতাশাগুলো কোথায় পিছে পড়ে থাকে!!

১২.০৯.২০১৩



তোমাকে ভালবাসি বলা হয়ে গেলে


তোমাকে ভালবাসি বলার সময় থেকে আমার জীবন বদলে যাবে
আমার কন্ঠস্বর বদলে যাবে, আমার চোখেরা নতুন করে দেখতে শিখবে
আমার সকালগুলো বদলে যাবে, দুপুরগুলো বদলে যাবে, আমার কবিতারা
বদলে যাবে, আমার আশাগুলো বদলে যাবে, হতাশারা বদলে যাবে।

তোমাকে ভালবাসি বলার পর থেকে সবকিছু নতুন করে শুরু হবে
আমার নক্ষত্রপুঞ্জের অন্য সব তারা তারস্বরে চিৎকার শুরু করবে
তাদের আলো ধীরে ধীরে কমতে কমতে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে যে
একমাত্র তোমার আলো ছাড়া অন্ধকারে ডুবে যাবে পুরো পৃথিবী।

তোমাকে ভালবাসি বলার পর থেকে কিছুই আগের মত থাকবে না আর
সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে পৃথিবীর সুন্দরীরা হয়ে যাবে পানসে
নেফারতিতি থেকে হেলেন, গ্রেটা গার্বো আর ঐশ্বর্য তোমার শরীরের ভাজ
দেখবার জন্যে তোমার আচল ধরে টানাটানি শুরু করলে নিরুপায় আমার
ঘরের খিল দেয়া ছাড়া আর কিইবা করার থাকবে।

তোমাকে ভালবাসি বলার পর থেকে আমার বয়স হয়ে যাবে ষোলো
সময় যন্ত্রগুলো ভুল করে পিছনের দিকে চলা শুরু করলে রোজ বিকেলের সফেদ
মেঘগুলো দিকভ্রান্ত হয়ে তোমার পায়ের কাছে এসে লুটোপুটি খাবে। তোমাকে
ভালোবাসি বলা হয়ে গেলে আর কিইবা বলার থাকবে আমার।

তোমাকে ভালবাসি বলা হয়ে গেলে শেষ বিকেলের রোদ, শীতের ওম সকাল
কিংবা দিগন্তের রঙ স্থির হয়ে ঝুলে থাকবে সমস্ত কবিদের ড্রইংরুমে।
কবিরা কবিতা ভুলে স্থির চেয়ে থাকবেন তোমার দিকে। তোমাকে
ভালবাসি বলা হয়ে গেলে একটা লঙ্কাকান্ড ঘটে যাবে সবদিকে।

তোমাকে ভালবাসি বলা হয়ে গেলে তোমার সমস্ত কিছু কেবল আমিমুখী
আমার দিকে ধাবিত হবে তোমার আশা ও শংকার সুউচ্চ মাস্তুল। আমাকে না দেখলে
তোমার চোখেরা ক্লান্ত হয়ে ঝুলে যাবে দখিনের জানালায়, আমাকে জড়িয়ে না ধরলে
তোমার নিয়মিত স্পর্শগুলো মনে হবে কুষ্ঠ রোগীর। তোমাকে ভালবাসি শোনার পর থেকে
ফিসফিসানি থেকে সমুদ্রের গর্জন কিছুই আর শ্রবনযোগ্য মনে হবে না তোমার।

তোমাকে ভালবাসি বলা হয়ে গেলে তুমি জান
বিশ্বব্রম্মান্ডে ঘটে যাবে একটা মারাত্বক অঘটন। বরং এই কি ভাল নয়
না শোনা আর্তি নিয়ে প্রতিদিন তুমি মুছে যাও ধূলো পড়া ছবির ফ্রেম
বের হয়ে উঠা তীক্ষ্ণ তারকাটার মাথা আলগোছে লুকিয়ে রেখে তুমি
জীবনের ঘ্রাণ নাও বুকের হাস্নুহেনার বাতাসে।

০২.০৯.২০১৩


Monday, August 12, 2013

স্বর্ণলতা অথবা মুক্তি

আমি আপনার কে হই
-তুমি ঘাসফুল ছুঁয়েছো কখনো
সবইতো আছে তবু আমার কাছে কি চাই আপনার
-খালি পায়ে হেটেছো শিশির ভেজা ঘাসে
বড় বেশি হেয়ালি আপনার, বলতেই হবে আজকে
-কেন অযথা জানতে চাও, সবই কি জানি আমি
না, আপনাকে বলতেই হবে; কে হই আমি আপনার
-তুমি, তুমি আমার ধরো মুক্তি
 কিংবা ধরো বারো তলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পরার সময়
 হঠাত গজিয়ে উঠা পাখা
মুক্তিই যদি হব তবে ছুঁতে চান কেন আমাকে, কেন জড়াতে চান
-মুক্তিকেও ছুঁতে হয় জড়াতে হয়
 গভীরে যেতে হয়

২৭।০৭।২০১৩

শেরপুর, সিলেট

Friday, July 5, 2013

উড়ন্ত চুম্বন


এই চুম্বন কি ছুঁয়েছে তোমার ঠোঁট
এই চুম্বন কি ছুঁয়েছে তোমার বুক
এই চুম্বন কি ছুঁয়েছে তোমার শরীর

এই চুম্বন তুমি লুকিয়ে রেখো নারী
এই চুম্বন কেবল আবেগের বাড়াবাড়ি।
এই চুম্বন তুমি লুকিয়ে রেখো আষ্টেপৃষ্টে গায়
ঝড় বাদলের দিনে দেখো ধুয়ে যেনো না যায়।

এই চুম্বন কেনো সেই চুম্বন নয়
সে এক জটিল ধাধা
এই চুম্বন মানে তোমার জন্য
জনম জনম কাঁদা।

দাহকালঃ ১৯৯৬

রচনাকালঃ ২০১৩

আমার কবিতারা পিষ্ট হোক তোমার পদতলে হে মানবিক ইশ্বর

(সাভারের ভবন ধসে নিহত প্রায় দেড় হাজার মানুষের পাশাপাশি কায়কোবাদ সহ সকল মানবিক ইশ্বরের উদ্দেশ্যে)

আমার পা সরেনা, হাত নড়েনা
প্রায় পক্ষকাল আমি মেতে আছি নির্দয় মানবিক ভোগে
নির্বাক আমি লাশের পর লাশ দেখি, মৃত্যুকূপ থেকে বের হয়ে আসা লাশ।
দূরনিয়ন্ত্রিত বোতামে ঘুরি রানা প্লাজার উপর থেকে নিচ
ভাষ্যকারের করুণ বাক্যবান আমাকে আপ্লুত করে প্লাবিত করে
আমি কাঁদি আমি কাঁদি, আমার পা সরেনা হাত নড়েনা
আমার বোধেরা সব নির্বোধ নিষ্প্রাণ,
সবল আমি মানবিক বৈকল্যে হয়ে যাই নিশ্চল জড়।

মনে মনে করুণ পংক্তি বানাই, তবু আমার পা সরেনা হাত নড়েনা।
সক্ষম আমি অক্ষমতার প্রায়শ্চিত্ত করি ফেসবুকে, আর ওদিকে
শত শত মানবিক ইশ্বর জেগে উঠে।
যে মুহূর্তে আমি লাইক দেই আর নিছক ব্যাক্তিগত
আবেগি সুখে লিখে চলি আর্ত কবিতা অথবা দুর্বিত্তায়নের বয়ান, সেই মুহূর্তে
শত শত ছেনি ছেনে চলে কংক্রিটের স্লাব।
যে মুহূর্তে নিজের আবেগি লেখায় তুষ্ট হয়ে অপক্ষা করি একেকটি লাইক এর
সেই মুহুর্তে শত শত মানবিক ইশ্বর
জীবনের মায়া তুচ্ছ করে কাঁধে তুলে নেয় রক্তাক্ত জীবন।
নুপুর পরা কিশোরির পা যখন পদাঘাত করে এই আলোকোজ্জ্বল সভ্যতার মুখে
সেই মুহূর্তে আমি
এই ভন্ড জীবনবাদী কি দারুণ বেঁচে থাকি নির্ভার।

যদিও জানি
আমার কবিতারা কেবলি ব্যক্তিগত মানবিক ভোগ আর
অতিমানবিক পংক্তিমালা কেবলি নির্দয় উপহাস
তবু ধাতব যন্ত্রে নিজের আঙ্গুল থেতলে দেয়ার পরিবর্তে
এখনো লিখছি এই জন্য যে
আমার সকল অক্ষম পংক্তিমালা তোমার পদতলে পিষ্ট হতে হতে
একদিন হয়ে যাবে সবল বজ্রমুষ্ঠি।

কায়কোবাদ, হে ইশ্বরের ও অধিক মানবিক অধিশ্বর।
তুমি বেঁচে থাক মানবতায়
আর আলোকবর্তিকা হয়ে জেগে থাক এই অন্ধকার নর্দমায়।

১৫.০৫.২০১৩


বৃষ্টির কবিতা


১।
বুকের ভেতর বৃষ্টিআর সঙ্গে মিঠু ।
আমরা যখন নীলখেত পেরুচ্ছিলাম হঠাৎই
আকাশ ভেঙ্গে  ঝুম বৃষ্টি। রিকশাওয়ালাকে
কসরত করতে হচ্ছিলো বৃষ্টির হাত থেকে
জমানো টাকা পয়সা বাঁচাতে। নতুন করে
ভেজার ভয় ছিলো না আমার আর মিঠুর কারোরই।

বরং বৃষ্টিই কখনো কখনো শুকিয়ে দেয় অনেক কিছু।

২।
ঢাকা শহরের ড্রেনেজ সিস্টেম খুবই নাজুক
সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় রাস্তাঘাট, ফুটপাত।
অঝোর বৃষ্টিতেও দেখো
আমার ভেতর কেমন শুকিয়ে কাঠ।

৩।
শহর জুড়ে ঝড়, আমার ভেতরে ঝঞ্ঝা
আজকাল শহরও শব্দ করে কাঁদে
কোনো কোনো বোকা মানুষ তাও পারে না।

৪।
 আমার কাছে স্মৃতি মানে বৃষ্টি
নষ্টালজিয়া মানে বৃষ্টিপাত।

৫।
 বৃষ্টি মানেই আর্দ্রতা, নারী মানেও তাই

৬।
তুমি আমি আর বৃষ্টিতে
রাতভর এই সৃষ্টিতে,
শরীর জুড়ে ইমন রাগ
রাগ মোচনে রাত্রি যাক।
রাত্রি এতো ছোটো কেনে
এসব কি আর শরীর জানে?
বাদল দিনে অফিস কি আর
মেঘলা শরীর বৃষ্টি নামাক।

১৪।০৬।২০১২