Monday, October 29, 2018

কাঁধ


লোকটার গা জ্বলে যাচ্ছিল।
বারান্দার গ্রীলের দিকে পিঠ দিয়ে রোদ পোহাচ্ছিল লোকটা। শীতকালে এই বারান্দায় সকাল বেলার রোদটা বেশ লাগে তাঁর। যদিও আজকে ভালো লাগাটা বোঝাই যাচ্ছিল না, কেবল জ্বলেই যাচ্ছিল সারা গা। রাতে ঘুমানো টি শার্টের ওপরই একটা মোটা সোয়েটায় চাপিয়ে দিয়েছে সকাল বেলা, তারপর সকালের কার্যাদি সেরে এই চেয়ারে বসেই নাস্তা, এখনো চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। বেশ সময় নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে লোকটা, কিন্তু গা’য়ের জ্বালাটা কমছেই না।
কাল রাতে ছোটখাট একটা পার্টি ছিল বাসায়। তাঁর খুব কাছের এক বন্ধু আরিফ সস্ত্রীক এসেছিল দাওয়াত খেতে। এই বন্ধুটি চাকরি বাকরিতে খুব একটা ভালো করেনি, আর সবার থেকে একটু পিছিয়েই বলা যায়। তবু বন্ধুত্বটা অটুটই আছে, বরং সে জন্যেই একটু বেশি আছে বলা যায়। মাঝে মাঝেই বন্ধুটিকে তাঁর সাহায্য করতে হয়সে করেও টুকটাক, যথাসম্ভব। আর তাই অন্য বন্ধুদের তুলনায় আরিফের আসা যাওয়াটা একটু বেশি।
কদিন আগে লোকটার জন্মদিনে শার্ট গিফট করেছিল তাঁর স্ত্রীনিজেই টেনে হিঁচড়ে দোকানে নিয়ে গেছিল শার্ট কিনে দেবে বলে। তো পছন্দ টছন্দ হয়ে গেলে কেনার সময় কি মনে করে যেন স্ত্রীকে বলল, তাহলে দুটো শার্ট কিনে দাও। একটা আরিফকেও দেই। স্ত্রীও কোনো প্রশ্ন না করেই দুটো শার্টই কিনে দিয়েছিল। ঘটনা সেখানেই শেষ। এরপর সে কয়েকবার শার্টটি পরেছে এবং যথারীতি এখন আর সেই শার্টটির কথা আলাদা করে মনে থাকার কোনো কারণও নাই।
কাল রাতে আড্ডা ভালই জমেছিল, গল্প গুজব খাওয়া দাওয়া সব কিছুই মাত্রাতিরিক্ত। ওঁরা চলে যাবার পর তাই বেশ ফুরফুরেই ছিল স্বামী স্ত্রী, শীত রাতেও ভালই উত্তাপ ছড়াচ্ছিল দুজনেরই শরীর। সন্তানদের চোখ এড়িয়েও বেশ কবারই কাছে ঘেঁষার অপচেষ্টা করেছে লোকটা। স্ত্রী কপট রাগে সরিয়ে দিয়েছে।
ঘুমের আগে অভ্যাস মত বিছানায় বসেই ল্যাপটপে মুখ গুজে ছিলেন তিনি। স্ত্রী মশারি টানাতে টানাতে কি কি সব বলেই যাচ্ছিলেন। এর মাঝেই বললেন
‘আরিফ ভাইকে শার্টটায় বেশ মানিয়েছে, কি বল?’
কোন শার্টটায়?
‘কেন আজকে যেটা পরে এলেন...তোমাকে আর আরিফ ভাইকে একসাথেই কিনে দিয়েছিলাম না এই শার্টটা?’
ও হ্যাঁ, তাইতো আমার তো মনেই ছিল না। ভালতো তুমি মনে রেখেছ।
‘মনে না রাখার কি আছে? মাসখানেক আগের কথা তো মাত্র।‘
আমিওতো কয়েকবার পরেছিলাম শার্টটা, আমাকে মনে হয় তত ভাল লাগেনি, কিছু বল নাই তো তখন।
‘না না কি বল, তোমাকেও ভাল লেগেছিল। বলি নাই? কি বল? বলেছিলাম তো মনে হয়। তবে আরিফ ভাইকে কিন্তু বেশ লাগছিল। আর উনার কাঁধ তো বেশ...’ কথা শেষ না হতেই হঠাৎই স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে তাকালেন লোকটা। স্বামীর হঠাৎ উঠে আসা চোখ থেকে নিজের আলো ঠিকরে বের হওয়া চোখ আর ঠোঁটে জমে থাকা সলাজ হাসি লুকাতে গিয়ে কেমন এলোমেলো করে ফেললেন স্ত্রী। স্বামীও হঠাৎ শুনে ফেলা ভুল শব্দ আর ভুল চোখ-মুখের হাসি দেখে ফেলে বেশ অপ্রস্তুততারপর তাদের আর কোনো কথাই হল না। তখন থেকেই লোকটার শরীরের উত্তাপ কমে গিয়ে শরীর জ্বালা করতে থাকলো, তিনি ল্যাপটপে মনযোগ দিতে থাকলেন। স্ত্রী পাশে শুয়ে কয়েকবার জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলেও তিনি গা জ্বালা নিয়ে কাঠ হয়ে ল্যাপটপে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করতে থাকলেন সারারাত।
সকালে রোদ বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে থেকেও তাঁর জ্বালাটা কমছে না। ভেতরের ঘরটা অন্ধকার থাকার কারণে স্লাইডিং দরজার কাচ তাকে ভালই প্রতিফলিত করছেনিজেকে কাচে দেখতে পেয়ে তিনি আরো জড়সড় হয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কাঁধ নিচু হতে হতে বুকের ভেতর মিশে যাচ্ছে যেন। একটা কাঁধহীন মানুষ দেখে তাঁর জ্বালাটা আরো বেড়ে যাচ্ছে।
তবু তিনি রোদে বসে আছেন। রোদে তাঁর পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। পুড়ুক...



1 comment:

  1. ওয়াও!!ঈর্ষা!!!! কবিদেরো ঈর্ষা হয়????

    ReplyDelete