Monday, December 7, 2020

সময়

 সময় কিনে নিয়েছে আমাকে, আমার সকাল সময়ের
দুপুর সময়ের, আমার রাত্রিও সময়ের। আমি যেখানে যেতে চাই
সেখানেও সময়ের নৌকা পাড়ি দিয়ে যেতে হয়।

আমার ক্লান্ত লাগে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি

পরশু মেঘনার ভাঙতে থাকা পারের ঠিক মাথায় দাঁড়িয়ে আমি অপেক্ষা করছিলাম সময়ের। কিছু দেবদূতের সঙ্গে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মিছিলে নেমেছিলাম কাল।
সমুদ্র শুয়ে ছিল তারই মত। তার লেজে পা দিতেই ফুঁসে উঠল সে
 
কী চাই আমি? কোথায় যেতে চাই?
 
তুমি যে হেঁটে যেতে যেতে
যেতে চাও রোদের দেশে ওই জুঁই-চাঁপায়, সেখানে অলস ঘুমায় এক পুঁইলতা
তার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মহাকাল

Monday, November 9, 2020

মরে গেলেও তুমি আর ভুল করবে না

তুমি তো অনেক কাঁদ, তোমার কান্না দেখতে আমার কীযে ভালো লাগতো!
কতদিন তোমার কান্না দেখিনা। আচ্ছা বলতো
আমি মরে গেলে তুমি আমাকে দেখতে আসবে?
 
আসবে না জানি, যদিও তোমার ইচ্ছে করবে
খুব ইচ্ছে করবে একটা মৃত কবিতাকে ছুঁয়ে দিতে
যে কবিতার অক্ষর, শব্দ তোমার কাছ থেকে ধার করা
তোমার অনাবাসে যারা দিনে দিনে সমৃদ্ধশালী হয়েছে
 
তবু তুমি আসবে না, মরে গেলেও তুমি আর ভুল করবে না
যদিও তুমি কখনোই ভুল করনা, এটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে
 
তোমার নির্ভুল চোখের জল আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করে
 
(ভেবনা আমি শীঘ্রই মরে যাব, তোমার কান্না দেখতে ইচ্ছে হল তাই এইরকম বানিয়ে একটা কবিতা লেখা। এটা পড়ে কি তুমি কাঁদবে? হয়তো কাঁদবে, কিন্তু আমি তো আর দেখতে পাব না।)

এই মানবজন্ম ছিল বেশ

শেষমেশ বলা যায়, এই মানবজন্ম ছিল বেশ।
এত এত অন্যায় অসাম্য অপ্রাপ্তি অসুখ মৃত্যু
সব শেষ-টেশ করে, যখন তাকাই দূরে
মনে হয়, হ্যাঁ, মনেই তো হয়
এই অর্থহীন মানব জীবনের রেশ, শেষমেশ লাগছে বেশ

 সারারাত শরীর জুড়ে চোরা একটা জ্বরে
গায়ে মাথায় কম্বল জড়িয়েও ঠাণ্ডা লাগছিল বেশ
তবুও অফিস, তবুও মিটিং, কাজ, খাবার, সন্তান, চিন্তা
যতক্ষণ আছে শ্বাস, বাঁচ মানুষ, নাচ মানুষ
লয়ে আহাজারি, থুয়ে আহাজারি, এইতো স্বর্গবাস
 
এইসব স্মৃতি, প্রেম প্রীতি, এইসব সাধ, ঝড়জলে আর্তনাদ
নিয়ে এসো বসি একদিন, কথা কই মৃত্যুর সাথে
মৃত্যুরে বলি, ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমারে
 
০৮.১১.২০২০

Saturday, October 24, 2020

ক্রোধ

সম্ভবত আমি নিজেকে চালাতে ব্যর্থ হচ্ছি, সহজেই
হারিয়ে ফেলছি নিজেরই অধিকার।
কালরাতে বন্ধুর পাঁচতারা হোটেলের মত বাড়ির সবুজ ঘাসে বসে থেকে
আকাশের একটা তারাও আমার পরিচিত মনে হয়নি
একটা মেঘও আমার জন্যে থামেনি এক মুহূর্ত। ঘূর্ণনরত
রীতিসিদ্ধ জল ছুঁতে গেলে আমার হাত সাড়া দেয়নি আমার ইচ্ছায়
 
আপনি সম্ভবত আমার ক্রোধের ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না,
ভুলতেও। আমি নিজেই বুঝতে পারছি না… আপনাকে আর কী বলি!
ইদানীং কোনো অপরাধবোধেও আর তাড়িত হই না। আসুন
পৃথিবীর সকল নীতিবাক্যের বই আমরা পুড়িয়ে ফেলি
 
অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে, আমি, ভবিষ্যতহীন আমি
আমার রোমকূপ শক্ত হয়ে যাওয়া ক্রোধান্ধ হাত বাড়িয়ে রাখি
শীতলতার আশায়
 
মোল্লাবাড়ির ঘাটে গোছলের সময় আশ্চর্যজনক ভাবেই
আমরা আমাদের সময় থামিয়ে রাখতে পারতাম। মেরামতের জন্য
উল্টো করে রাখা নৌকায় শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে আমাদের সাথে
দাঁড়িয়ে থাকত শীতের দুপুর
 
হায় স্বেচ্ছাচারিতা!
 
কবিতার মত স্বেচ্ছাচারী জীবন আপনাকে ভাবিয়ে তুলছে না?
 
২২.১০.২০২০

Thursday, October 15, 2020

মেক্সিকান কবি ওক্টাভিও পাজ (Octavio Paz Lozano) এর ‘Last Dawn’ কবিতার ভাবানুবাদ

 
তোমার চুল অরণ্যে হারিয়ে যায়
তোমার পা ছুঁয়ে থাকে আমার পা
ঘুমিয়ে থাকলে তুমি রাত্রির চেয়ে বড় হয়ে যাও
তবু তোমার স্বপ্নগুলো এই ঘরেরই মাপে
 
এই সামান্য আমরা এর বেশি আর কী পারি?
বাইরে একটা ট্যাক্সি যাচ্ছে
তার যাত্রীরা অশরীরী
যে নদীটা বয়ে যাচ্ছে
সে সবসময়
           পিছেই ছুটছে
 
আগামীকাল কি একটা অন্য দিন হবে?
 
১৬.১০.২০২০

Sunday, October 11, 2020

মাছরাঙ্গা

অনেকদিন পর প্রেমিকার দুঃখের মত দুঃখ পেয়ে
সারারাত ঘুম হল না
অনেকদিন পর প্রেমিকার মুখের মত মুখ মনে পড়ে
সারারাত ঘুম হল না
অনেকদিন পর
পাট ভেজানো জলের গন্ধের মত গন্ধ গায়ে মেখে
সারারাত শিশিরে ভিজেছি
 
আমাকে খুঁড়ে দেখবে বলে একটা মাছরাঙ্গা
ধার দিচ্ছিল তার ঠোঁটে, কী আশ্চর্য
আমি তার রঙিন ঠোঁটের প্রেমে পড়ে গেছি
 
রক্তাক্ত হব বলে আমি বাড়িয়ে রেখেছি আমার ঠোঁট

Friday, October 9, 2020

আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি

আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
এইখানে অবিরত ঝরে পাতা, আমি আলগোছে হাঁটি
বসি একটা শান্ত নদীর ধারে। ঝুমঝুম বেদনা
কুমকুম জল। তুমি আছ
তুমি নাই। কে হাঁটে ছলছল।
 
আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
 
বেদনার মত মৃত্তিকা, মৃত্তিকার মত বেদনা
আমি তুলে আনি জল
জলে ও জঙ্গলে বেদনা বিহ্বল।
আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
 
ও পাখি তুমি গাও
ও জল তুমি নাও
বেদনা বিধুর আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
আমি ডুবি, আমি ভাসি
কে দাঁড়ায় ওপারে, কে খোলে আগল
 
আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
 
১০.১০.২০২০

প্রলোভন

ফিরে যাচ্ছি। উপরে উন্নয়নের মত প্রগলভ হয়ে
তৈরি হয়েছে ব্রিজ। ওয়াই এর মত ঠ্যাং
ছড়িয়ে বসত গেড়েছে নদীর মধ্যখানে। এই তিতাসের মৃত্যুও আসন্ন প্রায়!
 
আম্মার কবর চেনা যায় না, ঝোপঝাড়, গর্ত, পানি
আমার স্মৃতির মত দুর্গম। তবু দাঁড়িয়ে ছিলাম
স্মৃতিহীন, যেন আমি শূন্যতার উপাসক
 
আব্বার কবর নতুন। একটু উঁচুতে, হেঁটে উঠে
যাওয়া যায় সহজে। আছে বোনের কবর, দাদার…দাদীর
নতুন মৃত্যু পুরোনো মৃত্যুকে ভুলিয়ে দেয় সহজেই।
মৃত্যুর এই বিশেষত্ব, জন্ম থেকে আলাদা
 
এই গ্রামে এখন আর আমাদের বসত নাই, কেবল
মৃত-আমাদের বসত। এবং আব্বার পরে সেই বসতও অনিশ্চিত।
 
ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া খুশির দৌড়ে
যে রাস্তা থেকে পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম অন্তত বিশ ফুট নিচে
সেইসব এখন সমতল, পাকা।
আমাদের বিশাল পুকুরও ভরাট হয়ে গেছে নদীর চিকচিকে বালিতে
 
নাইম কাক্কু আমাদের দেখাচ্ছিলেন সেই ভরাট হওয়া পুকুরের সমতল
পারে এখনো কিছু গাছ, কাচ মিঠা, ফজলি, জাম, তেঁতুল, বাঁশঝাড়,
আর কোনায় পারিবারিক কবরের জায়গাটায় একটা মাটির ঢিবি।
নাইম কাক্কু তাঁর অশরীরী হাত প্রায় বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে বললেন
‘এখানে যেখানে ইচ্ছা তোমাদের বাড়ি বানাতে পার’, বলে তাকাচ্ছিলেন
আমাদের সন্তানদের দিকে, স্ত্রীদের দিকে, বোনদের স্বামীদের দিকে
 
শেষমেশ আমার দিকে। জানি এটা তাঁর, তাঁদের বদান্যতা
আব্বা আগেই সব বেচে-টেচে সম্পর্কের ইতি টেনেছেন ভূরভূরিয়ার সাথে।
তবু এই প্রলোভনের বুদ্বুদ আমাকে নাড়িয়ে দেয় হঠাৎ করেই
 
চলে যাচ্ছি। সন্ধ্যার শান্ত লালিমা সখ্য গড়েছে আকাশ আর নদীতে
সামনের বাঁক পেরুলেই দৃষ্টিসীমারও বাইরে চলে যাবে আম্মার কবর
 
তবু আম্মার পাশে ঘুমাবার একটা প্রলোভনের বুদ্বুদ
ফুটতেই থাকে আমার ভেতরে
 
০৯.১০.২০২০

Thursday, September 24, 2020

কথোপকথন

 ১৯.০৮.২০২০

-দ্যাখেন, মেঘমালা ঝরছে
পছন্দ হইছে নামটা?
-হুম, খুব
নেবেন?
-দেবেন?
শব্দের মধ্যে যে অন্য শব্দেরা বাস করে
তাই কবিতা। কবিকে প্রশ্ন করতে নেই
-কবি এতো কাঠখোট্টা কীকরে হয়?
আমি মেঘমালা চাই না, আমার বৃষ্টিই ঢের
এইভাবে যে ঢের বলছো, জানো তো ঢের এ ঘের দেয়া
-জানি, নক্ষত্রের ঘের
তো? মেঘমালা না নিয়ে ঘের এ ঢুকে যাচ্ছ যে বড়!
-ইচ্ছে হলে ঢুকব, কার কী? ঈশ! নক্ষত্রের ঢের নিচের ঘের!!
শোনেন মশায়, আমি নক্ষত্রের উপরে থাকি, নিচে নয়
আমাকে ঘের দেয়া অত্ত সহজও নয়
তা জানি, নারী তো নিজেই নক্ষত্র
নক্ষত্র বিষে পুড়ে যায় দেহ
পাই বা না পাই, ছুটে যাই
👥

২১.০৯.২০২০

 

আমাকে ভেবেছিলে এই কয়দিন?
-হুম
কেন ভাব? কী হয়?
-এতো কিছু জেনে ভাবে মানুষ?
কী ভাবছিলে বল তো...কত আগের!
-তোমার মোবাইল নাম্বারটা, কেমন মুখস্ত এখনো দ্যাখো
  মনে আছে তোমার?
না। আর?
-আরও কত কী! সেইযে বরিশাল গেলে, সৌমেনের ঘর
হুম, বাদ দাও। কত বছর গেল। নিশ্চয় অনেক নতুন স্মৃতি হয়েছে
সেইসব ভাব। কী লাভ পুরোনোকে রেখে?
-আবারো লাভের কথা! কত পুরোনো দেখ এই শরীর, মন
  ফেলে দিতে পারছি?

 

 
 

Wednesday, September 23, 2020

সুন্দর

সুন্দর চোখ মেলে তাকালে সুন্দর
নড়ে উঠলে সুন্দর, শব্দ করলে সুন্দর
কথা বললে বেশি সুন্দর
সুন্দরে ঝড় উঠলে সুন্দর
আরও বেশি সুন্দর

 

 

Tuesday, September 22, 2020

আইডেনটিটি

ভর দুপুরের ঘুম তোমার স্বস্তি ফিরিয়ে আনছে না
ভাঙ্গা লোহা ও টিন স্তুপ হয়ে আছে বারান্দায়,
তুমি সফেদ চাদরে ভাসছ
এই জনাকীর্ণ শহরে কোথায় খুঁজছো মেঘমালা
 
মগজে কিলবিল করে ছোট মাছ, ঠোকরাচ্ছে হৃদয়
মিলান কুন্ডেরার ‘আইডেনটিটি’ পাশে ছড়ানো
মৃত মানুষের অভিনয়ে আর কত তুমি ভাসবে জলে
 
ছিঁড়ে ফেল অজ্ঞাতনামা চিঠি, মুখের আড়ালে মুখোশ
অনেক বাঁক ঘুরে প্রেম এসে দাঁড়ালে দরোজায়, স্মৃতির
খোঁড়লে চাপা দাও আর্ত পলিমাটি
 
২২.০৯.২০২০

ডিগবাজী

জীবন ওইখানে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম
আমাদের ছোটবেলায় জীবন শূন্যে ডিগবাজী খেত আমাদের সামনে
আমরা তাঁকে মামা ডাকতাম, জীবন মামা
 
জীবন মামার কী যে হল, আর কোনো খোঁজ জানিনা
মামার একটা ভাগ্নি ছিল ইভা। ইভার কথা মাঝে মাঝে
মনে হয়। লম্বাটে, ছিপছিপে। বেশ ফর্সা।
আমরা অবশ্য তখন ফর্সাকে সাদা বলতাম
সুন্দরী বলাটা ছিল আমাদের ভব্যতার সীমার বাইরে। তখন কেউ সুন্দরী ছিল না
কেউ কালো কেউ শ্যামলা কেউ সাদা। ইভা সাদা ছিল
 
আরো পরে এভারগ্রিনে কোচিং করার সময় এক ইভা ছিল আমাদের সাথে
সেও দেখতে একই রকম, লম্বা, ফর্সা। তবে সুন্দরী
তখন সুন্দরী বলা শিখে গেছি আমরা। ইভার সঙ্গে কথা বলার জন্য
ওর পাশে বসার জন্য সেকি চেষ্টা সকলের!
তারপর আমিই একদিন এভারগ্রিন ছেড়ে দিলাম। ইভা আবারো হারিয়ে গেল
 
জীবন এখনও পাশে দাঁড়ানো। তাকে জানি না। পাশ কাটিয়ে চলে যাই
জীবন মামাকে খুঁজি। তাঁর শূন্যে ডিগবাজী দেখার খুব ইচ্ছা ইদানীং
 
২১.০৯.২০২০

  

সাহস

আমার সাহসের অভাব অনেকেই যেমন জানেন আমিও জানি
জানা নিয়েও অজানা অনেক কথা থাকে, খুব রাতে
সেই অজানা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক জানা গল্পের
সুরাহা করতে আমি ব্যর্থ হই
 
একটা ভীষণ ঝড়ের রাতে আমি আব্বার সাথে ঘরের খুঁটি জাপটে ধরে কী এক সুরা পড়ে যাচ্ছিলাম জোরে জোরে। আর আমার বোনটা দরজা খুলে চলে গিয়েছিল আম কুড়াতে। সেই সাহস! সেই সাহসের বিন্দুমাত্রও আমি আয়ত্ব করিনি। আমার ভীরু হাত ধরে রেখে আমার সাহসী বোনটা একদিন মরে গেল। আমি সারারাত তাঁর দিকে তাকাতে পারিনি
 
আপনারা যারা পৃথিবীকে নতুন করে দাঁড় করাতে চান
তাঁদের সাধুবাদ। আমার মা মরে গিয়েছিলেন অপমান সইতে না পেরে
আমি এখনো বাঁচছি। বেঁচে আছি। আপনারাও আছেন
 
এই ঘিনঘিনে পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে সাহসী কাজ, কি বলেন?
 

১৯.০৯.২০২০ 

Friday, September 18, 2020

দুই লাইনের কবিতা


আমি প্রখর রোদে মাতাল হওয়া লোক
আমার কেবল মৃত্যুর দিকে ঝোক
  •  
 গৌন আর যৌনতায় ভরপুর পৃথিবী
আমি গৌন না হলেও যৌনতায় ঠিকই ভিজি

Thursday, September 3, 2020

মোহন, মৃত্তিকা ও নীলিমা

পৃথিবীর সমতলে হেঁটে চলার দিন শেষ
হে আমার প্রিয় কন্যারা, আমার অক্ষমতা তোমরা ইতোমধ্যেই জেনে গেছ
এই নিরানন্দ পৃথিবীতে আনন্দে থাকার কোনো সূত্রই আমি আয়ত্ব করতে পারিনি
তোমাদের শেখাবার মত কোনো জ্ঞান আমি অর্জন করতে পারিনি
 
একটা পরিত্যক্ত নৌকার গলুইয়ে বসে আমি তোমাদের বেড়ে উঠা দেখি
 
তোমাদেরও জন্মের অনেক আগে, তোমাদের জন্মের কোনো সম্ভাবনারও আগে
তোমাদের নামে আমি ভালোবাসাকে কৃতদাস করেছি
আর আরাধ্য করেছি এক হিজলগাছ।
তারপর
সেই কোমল হিজল গাছের পথে
                  হেঁটেছি নিরন্তর
 
প্রপিতামহ থেকে পিতামহ, পিতামহ থেকে পিতা, পিতা থেকে আমি
আমি থেকে প্রবহমান যে রক্তবীজ
তার সমস্ত দায় আমারই। আমার এই অনন্যোপায় ডানা ঝাপটানো
হে সন্ধ্যাকালীন হিজল গাছ
হে অনাবাসি আর্য চাঁদ
আমাকে লুকিয়ে রাখ তোমার আচ্ছাদিত বিহ্বল বিলাপে
 
আমার নগ্নতায় লুকানোর কিছু ছিল না, পৃথিবীর আচ্ছাদনের কাপড়
আমার শরীরকে কলুষিত করেছে
আমার প্রেমে জরাগ্রস্থ শীতকম্পন তুমিই জাগিয়ে দিয়েছ
হে নারী, ঈশ্বরের তীর্থযাত্রায় আমিও তোমার সঙ্গী ছিলাম
 
আপনারা যারা আমাকে পৃথিবীর নিয়ম টিয়ম শেখাচ্ছেন
তাঁদের বর্তুল ভাবনার চাপে পড়ে, মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে
আমি ভুলে গেছি কমলালেবু আসলে দেখতে কেমন হয়; যৎসামান্য আঁচড়ে
মৃত্তিকায় লেখা মা সমেত ‘অধিক অন্য কোনো নাম’ও মনে পড়ে না
 
মূলত, এ জীবন কেবলই আমার ছিল, আমি আর আমার
আমি আর আমার, আর একটা গোত্র ভুলে যাওয়া প্রজাপতির
 
পৃথিবীর মানচিত্রে ব্রহ্মাণ্ডের ঢেউ আছড়ে পড়ে, মৃত একটা শরীর ছাড়া
আর কিছুকেই আমার নিজের বলে মনে হয় না। আমি মানুষ নই,
নতুন জন্মে আমি গাছ হয়ে বাঁচবার স্বপ্ন দেখি
হে মানুষ মানুষে লালিত কালান্তরের পাপ
আমাকে মুক্ত করো তোমাদের ক্রোধ থেকে, সমুদয় বীভৎসতা থেকে
 
আমি বেঁচে আছি কিংবা বেঁচে ছিলাম
আমি বেঁচে থাকব, কিংবা হারিয়ে যাব অচিরেই
চোখ বন্ধ করে, কিছু মনে না রেখে, আমি এইসব নির্দয়তা ভুলে যেতে চাই
যেন আমার কখনো জন্মই হয়নি, মা বলে কাউকেই আমি
জানিনি কোনদিন। আমি বিষণ্ণতার গর্ভে জন্মেছিলাম
তারপর সকালের কোলাহলে জেগে উঠে দেখেছি রমনক্লান্ত স্বামী স্ত্রী
আর আধার খুঁজতে এসে বর্শীতে আটকাপড়া ক্রন্দনরত মৎসযুগল
 
একজন পরাজিত মানুষের বেঁকে যাওয়া মেরুদণ্ডকে তোমরা ক্ষমা করো
হে আমার প্রিয় কন্যারা,  নিজের ক্রোধ-উন্মত্ত আর জরাগ্রস্ত উত্তরাধিকার করা ছাড়া
তোমাদের দেয়ার মত কিছু নেই আমার, তোমাদের শেখাবার মত
কিছুই শিখিনি আমি, যে শিক্ষা তোমাদের সামনে অবারিত আজ
সেইসব আমার চেয়েও অক্ষম কোনো গল্পকারের নির্বোধ মিথ্যাচার
 
তোমরা বিশ্বাস রেখো পৃথিবীর সমান্তরাল ভালোবাসায়
 
আসবার সময় মায়ের কবরের ওপারে সবুজ কালিতে যে চিঠি আমি
লিখে রেখেছিলাম, তোমরা বিশ্বাস রেখো সেই সবুজে। আমার শব্দপুঞ্জে
সেই সবুজ আমি গেঁথে রেখে যাচ্ছি তোমাদের কথা ভেবে
একটা জীবন কেমন সবুজে আটকে যায়, কেমন কবিতা হয়ে যায়
 
আমি কেবল তোমাদের ভালবাসার দিকে নতজানু
ভোরের বাতাসে তোমরা কাশফুলের মত দুলে উঠো, হেসে উঠো
উদ্ভাসিত থেকো পৃথিবীর গোধূলিতে, যেখানে রংধনু ঝুলতে থাকে ভালোবাসার