ঝড়ে তছনছ হওয়া
একটা বাড়ির কথা ভাবেন, একটা টিন উড়ে গিয়ে কোথায় পড়ল আপনি জানেন না, অবশ্য যেটা চলে
যায় তার গন্তব্য জানার কোনো দরকার নাই। বরং শূন্য স্থানটা নিয়ে চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক ঘটনাটাই
আব্দুল হামিদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
আব্দুল হামিদের
স্ত্রী মারা গেল মাস তিনেক। তার দুই সন্তান, ছোটটার বয়স আড়াই। ওকে সামলানো খুবই কঠিন
হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য সামলায় ওর বড় বোন, আবদুল হামিদের প্রথম সন্তান। তার বয়স যদিও ১১- ১২’র বেশি না। তাছাড়া তাঁর মা
আছেন, বাবা আছেন। সব মিলে বাচ্চাটাকে কোলে পিঠে রাখতে কোনো সমস্যা না হলেও ওর গগনবিদারী
কান্না থামানোটা কষ্টকরই বটে।
আব্দুল হামিদ
মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। তাঁর পড়াশুনার রেকর্ড তেমন ভাল ছিল না, তবু শিক্ষক
হিশেবে তেমন খারাপ নন। বাঙলা পড়ান তিনি। সেকারণেই তাঁর পরিবারের দুর্দশা কাটানোর
সম্ভাবনা কম। বাবার কৃষিকাজে বাবা নিজেই তাকে রাখেননি, শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। সেই
হিশেবে শিক্ষিত হয়েছেনও বলা যায়, বি এ বি এড। কিন্তু পরিবাবের স্বচ্ছলতা ক্ষয়ে
যাচ্ছে দিনে দিনে। মা মরে যাওয়া আড়াই বছরের বাচ্চাটার দুধের যোগান দেয়া কষ্টকর হয়ে
যাচ্ছে। আটা গুলে জাউ এর মত কিছু একটা করে তাকে খাওয়ায় আব্দুল হামিদের মা বা তাঁর
মেয়ে।
আব্দুল হামিদের
স্ত্রীর মরে যাওয়াটা খুব অবাক করেছে তাঁকে। তিনি ভাবতেই পারেননি এমন কিছু একটা
হবে। এমন নির্বিবাদে কেউ মরে যেতে পারে? জীবন এতটা অগুরুত্বপূর্ণ কেমন করে হয়?
নাকি জীবনের চেয়ে ভালবাসা বড়, বিশ্বাস বড়? আব্দুল হামিদের বুক ভেঙে কান্না আসে।
আড়াই বছরের একটা বাচ্চা ফেলে কিকরে চলে যেতে পারে একজন মা? এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল
আব্দুল হামিদ তাঁর কাছে? আব্দুল হামিদ ঘর থেকে বের হয়ে যায়। দমকা বাতাস তাঁকে
ছুঁয়ে যায়। সূর্য ডুবে গেছে মাত্রই। একটা লালিমা সারা পারাপার জুড়ে। আব্দুল হামিদ
পুকুরের দিকে হাঁটতে থাকে।
মাধ্যমিক স্কুলের
এই চাকরিটার আগে জেলা শহরের কাছাকাছি একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়াত সে। স্কুলের পাশেই একটা বাড়িতে জায়গীর থাকত। জায়গীরের
যা শর্ত, খাওয়া থাকার বিনিময়ে ওই বাড়ির বাচ্চাদের পড়াতে হত। ওই বাড়ির বড় মেয়ে,
মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চমাধ্যমিকে পা দিয়েছে, তাঁকে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা ছিল না,
আব্দুল হামিদের সক্ষমতাও ছিল না ওকে পড়ানোর। তবু মাঝে মাঝেই সবার পড়া হয়ে গেলে
আব্দুল হামিদের ঘরে আসত, বই খুলে বেশ কিছু সময় কাটাত। মূলত আব্দুল হামিদের খাওয়া
গোছল আর ঘুমানোর আয়োজন ছিল এই মেয়েটারই তত্ত্বাবধানে। মেয়েটার যত্ন-আত্বি আব্দুল
হামিদের ভেতরের কোনো একটা না পাওয়াকে কেমন যেন নাড়িয়ে দিচ্ছিল। বেশ কবছর ছিলেন
তিনি ওই বাড়িতে। ফলে না চাইলেও এই অসম সখ্যতাটা বেড়েই যাচ্ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হল
এই সময়ে বাড়ি এলে তাঁর স্ত্রীর সাথে খটমটটাও বাড়ছিল একই হারে।
দেয়াল কিংবা
ইথার, কান যারই থাকুক না কেন, সেই কান থেকে এককান দু’কান করে জায়গীর বাড়িতে আব্দুল
হামিদের সখ্যতার খবরটা তাঁর স্ত্রীর কানেও পৌঁছে। গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে স্ত্রী ফোঁপাতে ফোঁপাতে
এই নিয়ে প্রশ্ন করলে আব্দুল হামিদ সেটাকে পাত্তাই দেয় না। বরং মানবিক অনটনেও শারীরিক
ক্ষুধা মেটানোর প্রক্রিয়া আরো জোরদার করেন, সেক্ষেত্রেও স্ত্রীর অনিচ্ছা একই রকমের
পাত্তাহীন থেকে যায়। এইসব ভালবাসাহীন, মানবিক অনটনের মাঝেই, জোরপূর্বক শারীরিক
মিলনের কোনো এক রাতে কিনা আমরা জানি না, নিয়মতান্ত্রিক ভ্রূণ দানা বাঁধে আজকের এই
আড়াই বছরের শিশুটির।
এরই মাঝে আব্দুল
হামিদের চাকরি হয় নিজেরই উপজেলার দুই তিন গ্রাম পরে একটি মাধ্যমিক স্কুলে। স্বাভাবিকভাবেই
সবচেয়ে বেশি খুশি হন আব্দুল হামিদের স্ত্রী। তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। যদিও তাঁর
হাঁফ, কোয়ার্টার থেকে হাফে পৌঁছার সময়ও পায় নাই ঠিকঠাক। কাপড় ধোয়ার জন্যে নিয়ে
যাওয়ার সময় স্বামীর ঢোলাঢালা পাঞ্জাবীর পকেটে তিনি খুঁজে পান একখানা সখ্যতা পত্র।
ইহা খুলিবা মাত্র তাঁহার রক্ত হিম হইয়া যায়। লোকে তাহলে ইহাকেই প্রেমপত্র বলে এবং
বিবাহ পরবর্তিতেও যে কোনো পুরুষকে কোনো ভিন্ন নারী এইরকম প্রেমপত্র লিখিতে পারে ইহা
কিছুতেই তাঁহার মাথায় ঢুকিতেছিল না। এরপর থেকে স্বামীর তিন কথার উত্তরে এক জবাব না
দেয়া স্ত্রীর মাথা বিগড়ে যেতে থাকে। স্বামীর কোনো কথায় আর নিরব থাকে না, যদিও এতে
হিতে বিপরীতই হয়। তাঁর শশুর শাশুড়ি তাঁহাদের পুত্রকে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হইতেছে এই
মর্মে তাঁকে তিরস্কার করেন এবং স্বামীর কথার উত্তরে কথা বলার জন্য তাঁর উপর নাখোশ
হন। এমত চলতেই থাকে এবং এরই মধ্যে আরো কয়েকটি প্রেমপত্র তাঁর হস্তগত হয় এবং তাঁর
মস্তিষ্ক বিকৃতি হচ্ছে বাড়ির মুরুব্বি সকলে প্রায় এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
মুরুব্বিগণের এইরূপ আস্কারায় আব্দুল হামিদ আরো বেশি বেহিসেবি হবে এতে অবাক হওয়ার
কিছু নাই। ফলস্বরূপ ইদানিং প্রায়ই স্কুলের কাজে আব্দুল হামিদের জেলা সদরে যাতায়াত
বাড়িয়া যায়। মরে যাওয়ার তিন চার দিন আগে আব্দুল হামিদের স্ত্রীর হাতে আরো একখানা
পত্র ফুড়ুৎ করিয়া আসিয়া পড়ে এবং এই ঘটনার পরই তাঁহার সমস্ত বাঁচিয়া থাকা অর্থহীন
হইয়া পড়ে। এই চিঠিতে কি এমন লেখা ছিল তাহা জানিবার মত ফুরসত তিনি আমাদেরকে দেন নাই, আর আব্দুল হামিদকে ইহা জিজ্ঞাসা
করিবার মত ধৃষ্টতা আমাদের কখনোই হইবে না। যাই
হোক, এই প্রায় স্বাভাবিক মৃত্যুকে মানিয়া
লইতে কারও তেমন কোনো অসুবিধা হয়নাই, শুধুমাত্র আড়াই বছরের ওই শিশুর চিৎকার ছাড়া।
এই তিন সন্ধ্যায়
পুকুরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আব্দুল হামিদের এইসব কথা কেন মনে হচ্ছে কে জানে। কাল
সকালে মুরুব্বি স্থানীয় একজনসহ আব্দুল হামিদ তাঁর প্রাক্তন জায়গীর বাড়িতে যাবে, আব্দুল হামিদের স্ত্রী হিশেবে ওই
বাড়ির বড় মেয়েটিকে যদি মুরুব্বিদের পছন্দ হয়। ঝড়ে উড়ে যাওয়া টিনের শূন্যস্থান পূরণই
গুরুত্বপূর্ণ, আড়াই বছরের বাচ্চার
চিৎকারও সেই ধারণা দেয় বলেই সবাই সাব্যস্ত করেছে। তাই দ্রুতই মেয়ে খোঁজার আয়োজন
শুরু করলে আব্দুল হামিদ তাঁর দৃঢ় অনীহা পোষণ করেন। শুধুমাত্র জায়গীর বাড়ির মেয়েটি হলে সে ভেবে দেখতে
পারে বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সেই হিসেবেই আগামীকাল সকালের এই সফর। আব্দুল হামিদ পুকুরের ঘাটে দাঁড়ায়। অজু
করে মগরিবের নামাজটা সেরে নেবে। যথাসম্ভব স্থির আর ভাবলেশহীন থাকতে চায় সে।
পুকুরের ওইপাশে একটা নুয়ে পড়া আম গাছের কিছু ডাল পানি ছুঁয়ে আছে। কি একটা বড়সড়
পাখি হঠাৎ করে ডানা ঝাঁপটে উড়ে গেলে আব্দুল হামিদ হঠাৎ হতচকিত হয়ে উঠে সেদিকে
তাকায়। প্রায় অন্ধকারে আব্দুল হামিদ পাখিটাকে চিনতে পারেন না।
রাতের খাবার সেরে
দখিনের জানালাটা খুলে আব্দুল হামিদ পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসেন। সন্ধ্যা হতে না হতেই খেয়ে দেয়ে ঘুমের আয়োজন করে
গ্রামের মানুষ। আশপাশের ঘরগুলি থেকে অনুচ্চস্বরের কথাবার্তাও মিইয়ে আসতে থাকে ধীরে
ধীরে। আব্দুল হামিদের একা লাগতে শুরু করে। আবার খাতা দেখায় মনোযোগ দেন তিনি। পাশের ঘর থেকে তাঁর বাচ্চাটার কান্না ভেসে আসে। ওকে
খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে বোধহয়। আব্দুল হামিদের উত্তরপত্র দেখা দ্রুততর হয়। কি সব যে
লেখে আজকাল ছেলেপেলেগুলো! ছেলেটার কান্না বাড়তেই
থাকে। আব্দুল হামিদ উত্তরপত্রে মনোযোগ রাখতে পারেন না। কান্না থামার জন্য অপেক্ষা
করতে থাকেন। ছেলেটার কান্না ধীরে ধীরে
চিৎকারে রূপান্তরিত হয়...আব্দুল হামিদের অস্থির লাগে। তিনি উঠে গিয়ে ছেলেকে কোলে
নেন, উঠানে পায়চারি করেন, পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু
কিছুতেই কিছু হয় না। তিনি বুঝতে পারেন না কি করবেন। তারপর ছেলেকে শক্ত করে বুকে
চেপে ধরে বিছানায় শুয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। ছেলেটা আব্দুল হামিদের বুকে
লেপ্টে থেকে নিপলের দিকে মুখ নিয়ে কি যেন খোঁজে আর নরম তীক্ষ্ণ নখে তাঁর বুক
আঁচড়াতে থাকে আর দমকে দমকে চিৎকার বাড়তেই থাকে।
হঠাৎ করেই কি যে
হয়ে যায় আব্দুল হামিদের! ছেলেকে একই রকম বুকে চেপে রেখে দরজা খুলে প্রায় দৌড়াতে
দৌড়াতে গ্রাম পেরিয়ে অদূরেই স্তব্ধতায় ঝিম মেরে থাকা কবরস্থানের পশ্চিম দিকটায়
পৌঁছে যায়। পারাপারের স্তব্ধতা ফালি ফালি
করে কেটে ছড়িয়ে পড়ছিল ছেলের চিৎকার। কি এক ঘোরে ছেলেকে একটা আইলে বসিয়ে দিয়ে নতুন
কবরটার পাশে পাগলের মত কি যেন খুঁজতে থাকেন আব্দুল হামিদ। একটা লাঠির মত কিছু হাতে
পেয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সপাং সপাং আঘাত করতে থাকেন নতুন কবরটার ফুলে থাকা
পেটে। হঠাৎই চিৎকার থেমে যায় ছেলেটার, চরাচর জুড়ে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এলে
সম্বিত ফিরে আসে আব্দুল হামিদেরও। একই রকম রুদ্ধশ্বাসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শূন্যতায় মিলিয়ে যেতে থাকেন আব্দুল
হামিদ।
ভরা পূর্নিমায়
প্রায় রাতেই ওই কবরের পেটে আমরা একটা আঁকাবাঁকা লাঠি পড়ে থাকতে দেখি।
০৯.০৫.২০১৮