Friday, December 21, 2018

অঙ্ক নয় কলায়


যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ
আপাতত এই পর্যন্ত থাক। শোচনীয় তোমার অঙ্ক জ্ঞান
যদিও তোমাতেই শিখি ধারাপাত, করি পাললিক ধ্যান
কৃষ্ণপক্ষ রাতে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখে পঞ্চমীর চাঁদ
বিভাজনের ঢঙে তুমি কর গুনিতক; সমুদয় প্রপাত
তোমার মুক্তবর্ণ স্তনে উঠে কবিতার ঝড়, অঙ্কে নয়
কলায় তুমি নিলাজ স্বয়ম্বর

তোমার চোখের মদে মাতাল হলে ভোর
পুরো কমলালেবু ভিজে উঠে, স্নাত হয় নিদান দুপুর

বিয়োগ গুণ ভাগ, আপাতত থাক
এসো ফোটাই যোগফুল, প্রেম আমাদের অবিভাজ্য হোক

২১.১২.২০১৮

Friday, December 14, 2018

এমন সব দিন, কোনো কোনো দিন


এমন সব দিন, কোনো কোনো দিন, নিজেরে মনে হয় বস্তুনিচয়
চেয়ার ছেড়ে বিচ্ছিন্ন পড়ে থাকা একটা ভাঙা হাতল, কেউ দেখে
কেউ না দেখেই পার হয়, এমন সব দিন, কোনো কোনো দিন

নিভাঁজ জামদানী তুমি নিজেই পুরুষ, নিছক ছুঁয়ে থাকার ছল
সময় ঘুরিয়ে দিলে আমি কই? আমি কি হয়ে যাই অন্য কেউ?
কোনো কোনো দিন, এমন সব দিন, এমন করে সবকিছু মিথ্যে মনে হয়
তোমাকে ছুঁয়ে দেখার নামে ছুঁয়ে দেই জলের কল, পুরোনো বই
তোমারও কী এমন হয়? নিজেরে মনে হয় বস্তুনিচয়?

মানুষের চেয়ে পাকা ধানের রঙ ভাবতে ভাল লাগে নিজেকে
কিংবা আলতো দুলতে থাকা ফুল। কিংবা স্থির হয়ে যাওয়া
সেইসব স্মৃতি, হাত উঁচিয়ে স্কুলের জানালার কবাট ছুঁতে ছুঁতে
হেঁটে চলা। ঘুম ভেঙে গেলে স্বপ্নে খাওয়া বড়ই’র বিচি খুঁজতে
পকেট হাতড়ানো কিংবা আড্ডার পিছনে একাকী তিন নম্বর লাল বল
এমন সব দিন, কোনো কোনো দিন, ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠি কাদাজল

যথেষ্ট জীবন নাই, মনে হয় তারচেয়ে বেশি জীবন ছিল নদীর
রাতের কান্না ঢাকতে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়লে মাঠে, আমাদের
ঘরে ফিরে যেতে হত, পাতার ফাঁক গলে ঝুলে থাকা দেখে
কীযে জ্যোৎস্না হয়ে যেতে ইচ্ছে করতো আমাদের। সেই সব দিন
কোনো কোনো দিন, জীবনেরে ছেড়ে ছুঁতে চায় অন্য জীবন
কিংবা জীবনই নয় কোনো, হয়তোবা মেঘ

মেঘেরা সুরের মত, সুরেরা মেঘ, জীবনের অন্য নাম সুখদ ক্লেদ


১০.১২.২০১৮

Tuesday, December 4, 2018

কোথাও জন্মগন্ধ নাই


কোথাও জন্মগন্ধ নাই, নাই ছুঁয়ে দেখার মত শরীর
তবু বাতাস খুঁজি, ছুটে যাই
ঝড়ো হাওয়ায় ডালপালা শুদ্ধ কাঁপতে থাকলে
ফুল ঠিকই আঁকড়ে থাকে মৌমাছি

কবরের পাশ দিয়ে রাস্তাটা এখনো তেমনি আছে
একপাশে মাটি ধ্বসে গিয়ে বিশাল খাদ
পার হতে গিয়ে বুক কাঁপে, প্রতীক্ষার কাছ থেকে
ফিরে আসি, আবার জীবন

মানুষের হাড়, মানুষের মাংস, মানুষের জমাট রক্তে
পৃথিবী কী ভীষণ উর্বরা, ধানের শীষে কী ভীষণ মৃদুতাল
আম, জাম, হিজলের বকুলের শিরশিরে শীতলতায়
আমি পেরুতে থাকি মায়ের ঘর,বোনের ঘর, ইদানিংকার বাবার

স্থায়ী নিবাস পেরিয়ে শৈশবে হাঁটি, কিছুই নেই আর
কেবল কল্পনাই সার, দখিনের জানালা বরাবর খাল
নলখাগড়ার ভূতুড়ে বিলাপ। সেখানে হাঁটুগেড়ে বসে
যে মাটি আমি ছুঁই, সেই মাটি প্রিয়জনের মৃত্যুতে উর্বর
প্রতীক্ষা, আমাদের প্রতীক্ষা কেবল অনাগত সময়ের

বিস্ময়কর স্বপ্নে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গ্রেনেডের মত রকেটগুলো
আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল ছেলেবেলায়। আজকাল সব অবান্তর

যে সরলরেখায় আপনি হাঁটছেন, নিচু হয়ে তার শেষে
আগে একটা পুটলি দিয়ে নিন

০৪.১২.২০১৮

ফেরা


তোমার যোগ্য নয় এ পৃথিবী, অথবা মানুষগুলো
এবং আমিও। তোমার যোগ্য হওয়ার জন্য আমি
শব্দহীন হতে চেয়েছিবিষাদে হয়েছি হত
তোমার আনত চোখে নতজানু থেকেছি, দুই হাত প্রসারিত

তুমি বৃক্ষতো নও! নাকি দুখিনী নদী
তোমার দুঃখে আমি বইছি নিরবধি

কাচের জানালায় তোমার মুখ। বাইরে অন্ধকার
আমি ফেরাতে পারিনা চোখ, আবার তাকাতেও পারি না
কী ভীষণ ঝড়ে বেঁকে যায় তোমার অনাড়ম্বর ঠোঁট!
কে বুঝিতে পারে, আমি ছাড়া! এই দ্বিচারি ছন্নছাড়া

ভবিষ্যতহীন পৃথিবীর পঙ্কিলতার দায় আমারও

জানি, তুমি ক্ষয়ে যাবে আরো, তোমার শীর্ণ হাত আর
কতটা নেবে পৃথিবীর ভার, আমাদের ইঁদুর দৌড় থেকে
পিছিয়ে থাকতেথাকতে থাকতেথাকতে থাকতেথাকতে
তুমি বেঁচে থাক হে ছায়াচ্ছন্ন ভোর...
শেষমেশ তোমার কাছে ছাড়া আর কোথায় ফেরার আছে আমার

ধ্বংস হতে হতে, ডুবতে ডুবতে অতঃপর
তোমার কাছেই গিয়ে ভাসব, তোমাতেই নির্বান

২৮.১০.১৮

Thursday, November 15, 2018

কবিতার জন্য প্রার্থনা


অনেক কিছু ভুলে যেতে চাই, অনেক নাম, শব্দ। মগজ ভরে আছে অর্থহীন সব শব্দে, বিশ্বাসে। কবিতা লিখতে গেলে সেইসব বিশ্বাস আমাকে টেনে ধরে, সেইসব প্রাচীন শব্দে শ্যাওলা জমে যায় আমার কবিতায়। যদিও খুব গোপনে সেই শ্যাওলাকে আমি ভালবাসি। আঙ্গুলে ছুঁয়ে দিতে দিতে সেইসব নরম নরম শ্যাওলাগুলোকে অভিনব প্রেমে জড়িয়ে থাকতে ভাল লাগে। আমি সেইসব কবিতা লিখতে চাই। ভাষাহীন কবিতা লিখতে চাই। রাজনীতি ধর্ম সীমানাহীন কবিতা লিখতে চাই। আমি ভালবাসার কবিতা লিখতে চাই, মানুষের কবিতা লিখতে চাই। কিন্তু মানুষ; এই শব্দটি মাঝে মাঝেই আমার বিবমিষা জাগায়। আরো অনেক শব্দ মেধা অজস্র নাম অজস্র কালো অক্ষর, এইসবের ভার আমি সইতে পারি না। আমার শরীর থেকে সরিয়ে ফেলতে চাই ভারী পোষাক, বৃষ্টি শেষে আমি হাঁটতে চাই কাদামাখা রাস্তায় পিছলে পড়ার ভয় নিয়ে। ছেলেবেলার সাদা তুলতুলে ওমওম পাখিটিকে গালে জড়িয়ে রেখে আমি কবিতাকে সঞ্চারিত করতে চাই আমাতে। হলুদাভ সবুজ ধানের নরম দুধ ঠোঁটে মেখে আমি হাঁটুগেড়ে দেখতে চাই কবিতার শরীর।
কবিতা আমাকে গ্রহণ কর

১২.১১.১৮

Monday, October 29, 2018

কাঁধ


লোকটার গা জ্বলে যাচ্ছিল।
বারান্দার গ্রীলের দিকে পিঠ দিয়ে রোদ পোহাচ্ছিল লোকটা। শীতকালে এই বারান্দায় সকাল বেলার রোদটা বেশ লাগে তাঁর। যদিও আজকে ভালো লাগাটা বোঝাই যাচ্ছিল না, কেবল জ্বলেই যাচ্ছিল সারা গা। রাতে ঘুমানো টি শার্টের ওপরই একটা মোটা সোয়েটায় চাপিয়ে দিয়েছে সকাল বেলা, তারপর সকালের কার্যাদি সেরে এই চেয়ারে বসেই নাস্তা, এখনো চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। বেশ সময় নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে লোকটা, কিন্তু গা’য়ের জ্বালাটা কমছেই না।
কাল রাতে ছোটখাট একটা পার্টি ছিল বাসায়। তাঁর খুব কাছের এক বন্ধু আরিফ সস্ত্রীক এসেছিল দাওয়াত খেতে। এই বন্ধুটি চাকরি বাকরিতে খুব একটা ভালো করেনি, আর সবার থেকে একটু পিছিয়েই বলা যায়। তবু বন্ধুত্বটা অটুটই আছে, বরং সে জন্যেই একটু বেশি আছে বলা যায়। মাঝে মাঝেই বন্ধুটিকে তাঁর সাহায্য করতে হয়সে করেও টুকটাক, যথাসম্ভব। আর তাই অন্য বন্ধুদের তুলনায় আরিফের আসা যাওয়াটা একটু বেশি।
কদিন আগে লোকটার জন্মদিনে শার্ট গিফট করেছিল তাঁর স্ত্রীনিজেই টেনে হিঁচড়ে দোকানে নিয়ে গেছিল শার্ট কিনে দেবে বলে। তো পছন্দ টছন্দ হয়ে গেলে কেনার সময় কি মনে করে যেন স্ত্রীকে বলল, তাহলে দুটো শার্ট কিনে দাও। একটা আরিফকেও দেই। স্ত্রীও কোনো প্রশ্ন না করেই দুটো শার্টই কিনে দিয়েছিল। ঘটনা সেখানেই শেষ। এরপর সে কয়েকবার শার্টটি পরেছে এবং যথারীতি এখন আর সেই শার্টটির কথা আলাদা করে মনে থাকার কোনো কারণও নাই।
কাল রাতে আড্ডা ভালই জমেছিল, গল্প গুজব খাওয়া দাওয়া সব কিছুই মাত্রাতিরিক্ত। ওঁরা চলে যাবার পর তাই বেশ ফুরফুরেই ছিল স্বামী স্ত্রী, শীত রাতেও ভালই উত্তাপ ছড়াচ্ছিল দুজনেরই শরীর। সন্তানদের চোখ এড়িয়েও বেশ কবারই কাছে ঘেঁষার অপচেষ্টা করেছে লোকটা। স্ত্রী কপট রাগে সরিয়ে দিয়েছে।
ঘুমের আগে অভ্যাস মত বিছানায় বসেই ল্যাপটপে মুখ গুজে ছিলেন তিনি। স্ত্রী মশারি টানাতে টানাতে কি কি সব বলেই যাচ্ছিলেন। এর মাঝেই বললেন
‘আরিফ ভাইকে শার্টটায় বেশ মানিয়েছে, কি বল?’
কোন শার্টটায়?
‘কেন আজকে যেটা পরে এলেন...তোমাকে আর আরিফ ভাইকে একসাথেই কিনে দিয়েছিলাম না এই শার্টটা?’
ও হ্যাঁ, তাইতো আমার তো মনেই ছিল না। ভালতো তুমি মনে রেখেছ।
‘মনে না রাখার কি আছে? মাসখানেক আগের কথা তো মাত্র।‘
আমিওতো কয়েকবার পরেছিলাম শার্টটা, আমাকে মনে হয় তত ভাল লাগেনি, কিছু বল নাই তো তখন।
‘না না কি বল, তোমাকেও ভাল লেগেছিল। বলি নাই? কি বল? বলেছিলাম তো মনে হয়। তবে আরিফ ভাইকে কিন্তু বেশ লাগছিল। আর উনার কাঁধ তো বেশ...’ কথা শেষ না হতেই হঠাৎই স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে তাকালেন লোকটা। স্বামীর হঠাৎ উঠে আসা চোখ থেকে নিজের আলো ঠিকরে বের হওয়া চোখ আর ঠোঁটে জমে থাকা সলাজ হাসি লুকাতে গিয়ে কেমন এলোমেলো করে ফেললেন স্ত্রী। স্বামীও হঠাৎ শুনে ফেলা ভুল শব্দ আর ভুল চোখ-মুখের হাসি দেখে ফেলে বেশ অপ্রস্তুততারপর তাদের আর কোনো কথাই হল না। তখন থেকেই লোকটার শরীরের উত্তাপ কমে গিয়ে শরীর জ্বালা করতে থাকলো, তিনি ল্যাপটপে মনযোগ দিতে থাকলেন। স্ত্রী পাশে শুয়ে কয়েকবার জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলেও তিনি গা জ্বালা নিয়ে কাঠ হয়ে ল্যাপটপে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করতে থাকলেন সারারাত।
সকালে রোদ বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে থেকেও তাঁর জ্বালাটা কমছে না। ভেতরের ঘরটা অন্ধকার থাকার কারণে স্লাইডিং দরজার কাচ তাকে ভালই প্রতিফলিত করছেনিজেকে কাচে দেখতে পেয়ে তিনি আরো জড়সড় হয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কাঁধ নিচু হতে হতে বুকের ভেতর মিশে যাচ্ছে যেন। একটা কাঁধহীন মানুষ দেখে তাঁর জ্বালাটা আরো বেড়ে যাচ্ছে।
তবু তিনি রোদে বসে আছেন। রোদে তাঁর পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। পুড়ুক...



কেমন মানিয়ে যাচ্ছে


সবার সবকিছু মানায় না, তবু তুমি যখন
সূর্যমুখী সিনেমা হলের সামনে দিয়ে জগন্নাথপুর হয়ে
বাঁশগাড়ির দিকে যাওয়া খালটা বেচে দিয়ে ছাদের
সুইমিংপুলে ডুব সাঁতার দিচ্ছ রোজ, কেমন মানিয়ে যায়।

আমরা বালির ঘর বানাতাম মিথ্যামিথ্যি, তারপর
ভেঙে দিয়ে সত্যসত্য জীবন বানাতে গেলে
প্রায়ই আমাদের মিথ্যামিথ্যি বালির ঘরের কথা মনে হয়
এইসব সত্যসত্য জীবন, মিথ্যামিথ্যি অনুভব
করতলে তুলে ধরা জলের মতন কেমন মানিয়ে যায়

এইসব মানিয়ে যাওয়া স্তূপে পৃথিবীর ঠোঁট জেগে উঠলে
আবার প্রেমে পড়ে যাই, জাদুমন্ত্রের মত টুকরো কাচগুলো
উড়ে এসে জোড়া লেগে যায় আমাদের অবিশ্বস্ত চুম্বনেও।

চুম্বন, ভালবাসার স্বপ্নঘোরে তৃষ্ণাচ্ছন্ন এমন

২৭.১০.১৮

Thursday, October 25, 2018

মাতাল ও পূর্ণ ইমন চাঁদবিবি

স্লামালেকুম স্যার...শ্যালের সিঁড়িতে কুয়াশা
ও ভাই কী কন? আমি তো কিছু দেখতেছি না...

না দেখতে না দেখতে বাংলা মটরের জেব্রা ক্রসিং
পার হইতে না হইতে একটা আস্ত চাঁদ আমাগো চাইপা ধরল
আমাদের পা টালমাটাল হইল, ও চাঁদবিবি
ইস্কাটন গার্ডেনের চওড়া রাস্তায় তুমি উদাম হাঁট কেন
ফুটপাথ দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখছে কেডা? আমরা কী তবে
গাড়ি? এহ হে হে... রাস্তা তোর সাথে আড়ি

‘সিমেন্টের রাস্তায় গরু ঘাস খায়
ও কুলসুম তুমি কোথায়?’

২৪.১০.১৮

Tuesday, October 23, 2018

চিৎকার


ঝড়ে তছনছ হওয়া একটা বাড়ির কথা ভাবেন, একটা টিন উড়ে গিয়ে কোথায় পড়ল আপনি জানেন না, অবশ্য যেটা চলে যায় তার গন্তব্য জানার কোনো দরকার নাইবরং শূন্য স্থানটা নিয়ে চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক ঘটনাটাই আব্দুল হামিদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।

আব্দুল হামিদের স্ত্রী মারা গেল মাস তিনেক। তার দুই সন্তান, ছোটটার বয়স আড়াই। ওকে সামলানো খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য সামলায় ওর বড় বোন, আবদুল হামিদের প্রথম সন্তানতার বয়স যদিও ১১- ১২’র বেশি না। তাছাড়া তাঁর মা আছেন, বাবা আছেন। সব মিলে বাচ্চাটাকে কোলে পিঠে রাখতে কোনো সমস্যা না হলেও ওর গগনবিদারী কান্না থামানোটা কষ্টকরই বটে।

আব্দুল হামিদ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। তাঁর পড়াশুনার রেকর্ড তেমন ভাল ছিল না, তবু শিক্ষক হিশেবে তেমন খারাপ নন। বাঙলা পড়ান তিনি। সেকারণেই তাঁর পরিবারের দুর্দশা কাটানোর সম্ভাবনা কম। বাবার কৃষিকাজে বাবা নিজেই তাকে রাখেননি, শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। সেই হিশেবে শিক্ষিত হয়েছেনও বলা যায়, বি এ বি এড। কিন্তু পরিবাবের স্বচ্ছলতা ক্ষয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। মা মরে যাওয়া আড়াই বছরের বাচ্চাটার দুধের যোগান দেয়া কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। আটা গুলে জাউ এর মত কিছু একটা করে তাকে খাওয়ায় আব্দুল হামিদের মা বা তাঁর মেয়ে।
আব্দুল হামিদের স্ত্রীর মরে যাওয়াটা খুব অবাক করেছে তাঁকে। তিনি ভাবতেই পারেননি এমন কিছু একটা হবে। এমন নির্বিবাদে কেউ মরে যেতে পারে? জীবন এতটা অগুরুত্বপূর্ণ কেমন করে হয়? নাকি জীবনের চেয়ে ভালবাসা বড়, বিশ্বাস বড়? আব্দুল হামিদের বুক ভেঙে কান্না আসে। আড়াই বছরের একটা বাচ্চা ফেলে কিকরে চলে যেতে পারে একজন মা? এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল আব্দুল হামিদ তাঁর কাছে? আব্দুল হামিদ ঘর থেকে বের হয়ে যায়। দমকা বাতাস তাঁকে ছুঁয়ে যায়। সূর্য ডুবে গেছে মাত্রই। একটা লালিমা সারা পারাপার জুড়ে। আব্দুল হামিদ পুকুরের দিকে হাঁটতে থাকে।

মাধ্যমিক স্কুলের এই চাকরিটার আগে জেলা শহরের কাছাকাছি একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়াত সেস্কুলের পাশেই একটা বাড়িতে জায়গীর থাকত। জায়গীরের যা শর্ত, খাওয়া থাকার বিনিময়ে ওই বাড়ির বাচ্চাদের পড়াতে হত। ওই বাড়ির বড় মেয়ে, মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চমাধ্যমিকে পা দিয়েছে, তাঁকে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা ছিল না, আব্দুল হামিদের সক্ষমতাও ছিল না ওকে পড়ানোর। তবু মাঝে মাঝেই সবার পড়া হয়ে গেলে আব্দুল হামিদের ঘরে আসত, বই খুলে বেশ কিছু সময় কাটাত। মূলত আব্দুল হামিদের খাওয়া গোছল আর ঘুমানোর আয়োজন ছিল এই মেয়েটারই তত্ত্বাবধানে। মেয়েটার যত্ন-আত্বি আব্দুল হামিদের ভেতরের কোনো একটা না পাওয়াকে কেমন যেন নাড়িয়ে দিচ্ছিল। বেশ কবছর ছিলেন তিনি ওই বাড়িতে। ফলে না চাইলেও এই অসম সখ্যতাটা বেড়েই যাচ্ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হল এই সময়ে বাড়ি এলে তাঁর স্ত্রীর সাথে খটমটটাও বাড়ছিল একই হারে।
দেয়াল কিংবা ইথার, কান যারই থাকুক না কেন, সেই কান থেকে এককান দু’কান করে জায়গীর বাড়িতে আব্দুল হামিদের সখ্যতার খবরটা তাঁর স্ত্রীর কানেও পৌঁছেগভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে স্ত্রী ফোঁপাতে ফোঁপাতে এই নিয়ে প্রশ্ন করলে আব্দুল হামিদ সেটাকে পাত্তাই দেয় না। বরং মানবিক অনটনেও শারীরিক ক্ষুধা মেটানোর প্রক্রিয়া আরো জোরদার করেন, সেক্ষেত্রেও স্ত্রীর অনিচ্ছা একই রকমের পাত্তাহীন থেকে যায়। এইসব ভালবাসাহীন, মানবিক অনটনের মাঝেই, জোরপূর্বক শারীরিক মিলনের কোনো এক রাতে কিনা আমরা জানি না, নিয়মতান্ত্রিক ভ্রূণ দানা বাঁধে আজকের এই আড়াই বছরের শিশুটির।

এরই মাঝে আব্দুল হামিদের চাকরি হয় নিজেরই উপজেলার দুই তিন গ্রাম পরে একটি মাধ্যমিক স্কুলে। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি খুশি হন আব্দুল হামিদের স্ত্রী। তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। যদিও তাঁর হাঁফ, কোয়ার্টার থেকে হাফে পৌঁছার সময়ও পায় নাই ঠিকঠাক। কাপড় ধোয়ার জন্যে নিয়ে যাওয়ার সময় স্বামীর ঢোলাঢালা পাঞ্জাবীর পকেটে তিনি খুঁজে পান একখানা সখ্যতা পত্র। ইহা খুলিবা মাত্র তাঁহার রক্ত হিম হইয়া যায়। লোকে তাহলে ইহাকেই প্রেমপত্র বলে এবং বিবাহ পরবর্তিতেও যে কোনো পুরুষকে কোনো ভিন্ন নারী এইরকম প্রেমপত্র লিখিতে পারে ইহা কিছুতেই তাঁহার মাথায় ঢুকিতেছিল না। এরপর থেকে স্বামীর তিন কথার উত্তরে এক জবাব না দেয়া স্ত্রীর মাথা বিগড়ে যেতে থাকে। স্বামীর কোনো কথায় আর নিরব থাকে না, যদিও এতে হিতে বিপরীতই হয়। তাঁর শশুর শাশুড়ি তাঁহাদের পুত্রকে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হইতেছে এই মর্মে তাঁকে তিরস্কার করেন এবং স্বামীর কথার উত্তরে কথা বলার জন্য তাঁর উপর নাখোশ হন। এমত চলতেই থাকে এবং এরই মধ্যে আরো কয়েকটি প্রেমপত্র তাঁর হস্তগত হয় এবং তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি হচ্ছে বাড়ির মুরুব্বি সকলে প্রায় এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হন। মুরুব্বিগণের এইরূপ আস্কারায় আব্দুল হামিদ আরো বেশি বেহিসেবি হবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। ফলস্বরূপ ইদানিং প্রায়ই স্কুলের কাজে আব্দুল হামিদের জেলা সদরে যাতায়াত বাড়িয়া যায়। মরে যাওয়ার তিন চার দিন আগে আব্দুল হামিদের স্ত্রীর হাতে আরো একখানা পত্র ফুড়ুৎ করিয়া আসিয়া পড়ে এবং এই ঘটনার পরই তাঁহার সমস্ত বাঁচিয়া থাকা অর্থহীন হইয়া পড়ে। এই চিঠিতে কি এমন লেখা ছিল তাহা জানিবার মত ফুরসত তিনি আমাদেরকে দেন নাই, আর আব্দুল হামিদকে ইহা জিজ্ঞাসা করিবার মত ধৃষ্টতা আমাদের কখনোই হইবে না। যাই হোক, এই প্রায় স্বাভাবিক মৃত্যুকে মানিয়া লইতে কারও তেমন কোনো অসুবিধা হয়নাই, শুধুমাত্র আড়াই বছরের ওই শিশুর চিৎকার ছাড়া।

এই তিন সন্ধ্যায় পুকুরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আব্দুল হামিদের এইসব কথা কেন মনে হচ্ছে কে জানে। কাল সকালে মুরুব্বি স্থানীয় একজনসহ আব্দুল হামিদ তাঁর প্রাক্তন জায়গীর বাড়িতে যাবে, আব্দুল হামিদের স্ত্রী হিশেবে ওই বাড়ির বড় মেয়েটিকে যদি মুরুব্বিদের পছন্দ হয়। ঝড়ে উড়ে যাওয়া টিনের শূন্যস্থান পূরণই গুরুত্বপূর্ণ, আড়াই বছরের বাচ্চার চিৎকারও সেই ধারণা দেয় বলেই সবাই সাব্যস্ত করেছে। তাই দ্রুতই মেয়ে খোঁজার আয়োজন শুরু করলে আব্দুল হামিদ তাঁর দৃঢ় অনীহা পোষণ করেনশুধুমাত্র জায়গীর বাড়ির মেয়েটি হলে সে ভেবে দেখতে পারে বলে জানিয়ে দিয়েছেনসেই হিসেবেই আগামীকাল সকালের এই সফর। আব্দুল হামিদ পুকুরের ঘাটে দাঁড়ায়। অজু করে মগরিবের নামাজটা সেরে নেবে। যথাসম্ভব স্থির আর ভাবলেশহীন থাকতে চায় সে। পুকুরের ওইপাশে একটা নুয়ে পড়া আম গাছের কিছু ডাল পানি ছুঁয়ে আছে। কি একটা বড়সড় পাখি হঠাৎ করে ডানা ঝাঁপটে উড়ে গেলে আব্দুল হামিদ হঠাৎ হতচকিত হয়ে উঠে সেদিকে তাকায়। প্রায় অন্ধকারে আব্দুল হামিদ পাখিটাকে চিনতে পারেন না।

রাতের খাবার সেরে দখিনের জানালাটা খুলে আব্দুল হামিদ পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসেনসন্ধ্যা হতে না হতেই খেয়ে দেয়ে ঘুমের আয়োজন করে গ্রামের মানুষ। আশপাশের ঘরগুলি থেকে অনুচ্চস্বরের কথাবার্তাও মিইয়ে আসতে থাকে ধীরে ধীরে। আব্দুল হামিদের একা লাগতে শুরু করে। আবার খাতা দেখায় মনোযোগ দেন তিনিপাশের ঘর থেকে তাঁর বাচ্চাটার কান্না ভেসে আসে। ওকে খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে বোধহয়। আব্দুল হামিদের উত্তরপত্র দেখা দ্রুততর হয়। কি সব যে লেখে আজকাল ছেলেপেলেগুলো!  ছেলেটার কান্না বাড়তেই থাকে। আব্দুল হামিদ উত্তরপত্রে মনোযোগ রাখতে পারেন না। কান্না থামার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেনছেলেটার কান্না ধীরে ধীরে চিৎকারে রূপান্তরিত হয়...আব্দুল হামিদের অস্থির লাগে। তিনি উঠে গিয়ে ছেলেকে কোলে নেন, উঠানে পায়চারি করেন, পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। তিনি বুঝতে পারেন না কি করবেন। তারপর ছেলেকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে বিছানায় শুয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। ছেলেটা আব্দুল হামিদের বুকে লেপ্টে থেকে নিপলের দিকে মুখ নিয়ে কি যেন খোঁজে আর নরম তীক্ষ্ণ নখে তাঁর বুক আঁচড়াতে থাকে আর দমকে দমকে চিৎকার বাড়তেই থাকে।

হঠাৎ করেই কি যে হয়ে যায় আব্দুল হামিদের! ছেলেকে একই রকম বুকে চেপে রেখে দরজা খুলে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রাম পেরিয়ে অদূরেই স্তব্ধতায় ঝিম মেরে থাকা কবরস্থানের পশ্চিম দিকটায় পৌঁছে যায়পারাপারের স্তব্ধতা ফালি ফালি করে কেটে ছড়িয়ে পড়ছিল ছেলের চিৎকার। কি এক ঘোরে ছেলেকে একটা আইলে বসিয়ে দিয়ে নতুন কবরটার পাশে পাগলের মত কি যেন খুঁজতে থাকেন আব্দুল হামিদ। একটা লাঠির মত কিছু হাতে পেয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সপাং সপাং আঘাত করতে থাকেন নতুন কবরটার ফুলে থাকা পেটে। হঠাৎই চিৎকার থেমে যায় ছেলেটার, চরাচর জুড়ে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এলে সম্বিত ফিরে আসে আব্দুল হামিদেরওএকই রকম রুদ্ধশ্বাসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শূন্যতায় মিলিয়ে যেতে থাকেন আব্দুল হামিদ

ভরা পূর্নিমায় প্রায় রাতেই ওই কবরের পেটে আমরা একটা আঁকাবাঁকা লাঠি পড়ে থাকতে দেখি


০৯.০৫.২০১৮

Saturday, October 13, 2018

দুঃস্বপ্ন


আমি ঘর থাইকা বাইর হইতে গেলে আব্বা আমার দিকে চাইয়া থাকে। কিছু কয় না। আমি মাথা নিচু কইরা বাইর হইয়া যাই। ঘরে অনেক মেহমান, আমার থাকনের জায়গা নাই। আমি বাইরে থাকমু। তবু আব্বা চাইয়া থাকে কেন। আমি অন্য ঘরে যাই, অন্য ঘরে গিয়া ফাঁকা বিছনা পাইয়া আমি কবিতা লেখি। এর মধ্যে একটা মাইয়া উপুর হইয়া শুইয়া আমার কবিতা পড়ে। আমি তারে আমার কলম দিয়া গুতা দেই। তার পিঠে, তার মাংসে গুতা দেই। মাইয়াটা খিল খিল কইরা হাসে। আবার অন্য মানুষজন আইসা আমার বিছানা ভইরা যায়। ওই মাইয়া আমারে কয় অন্য ঘরে চলেন। আমি অন্য ঘরে যাই। সেইখানেও মানুষ। এর মধ্যে অন্য একটা খাটে মশারী খাটাইতে খাটাইতে মনে হইল না বাইরে যাই। বাইরে গিয়া দেখি জোছনা আর বন্যায় দুনিয়া ভাইস্যা যাইতাছে। আমার ঘরের সামনের মাঠে আমি সাতরাইতে থাকি। আমারতো যাইতেই হইব। কিন্তু কই যাইতে হইব জানি না। মাইয়াটা এর মইধ্যে হারাইয়া যায়। আমি সাতরাইয়া মাঝ মাঠে যাইতে যাইতেই পানি হাওয়া হইয়া যায়। দেখি এই মাঝরাইতে মাঠের মইধ্যে চাঁদের হাট। ভয়ানক জোছনায় মানুষজন চেয়ার টেবিলে বইসা আনন্দ করতাছে। আমি এইসব পার হইয়া যাই। পার হইয়া ভোকেশনালের (যদিও আমার গোবিন্দ ভবনের কথা মনে হইতেছিল) পাকা রাস্তায় উঠি। এর মধ্যে আমার সৎ মায়ের গলা শুনা যায়। আমি পাত্তা না দিয়া হাইটা খোকনদের বাড়ির দিকে যাই। গাছপালার জঙ্গলের মধ্যে দিয়া আমি খোকনদের বাড়ি পার হইয়া শাহিনদের বাড়ির দিকে যাইতে থাকি। এর মধ্যে মনে হইতেছে আব্বা আবার বদনা লইয়া টাট্টির দিকে যাইতে যাইতে আমারে দেইখা ফেলছেমইরা যাওয়ার পরে দেখি আব্বার স্বাস্থ্য আরো ভাল হইছে। আমি গাছাপালার আড়ালে লুকাইয়া যাইআব্বা চাইয়াই থাকে। তবু আমি নিচু হইয়া শাহীনদের বাড়ির দিকে যাইতে থাকি। শাহীনের বাড়ির কোনায় পোলাপাইনের আসর বসছে। শাহীন ভাল ছেলে, শাহীন ওইসবে নাই। কিন্তু আমার ওইখানে যাইতেই হইব। আরেকটু আগাইয়া দেখি শাহীনের আব্বা চাপকলে গোছল করতেছে। উনিও মইরা গেছেন গত বছর। আমার খটকা লাগতেছে। আমি কিছুতেই আগাইতে পারতেছি না। কিন্তু আমারতো যাইতেই হইব।

১৩.১০.২০১৮


Friday, October 12, 2018

অভিমান কেন সরে না এখনো


একটাই বুক আজন্ম লেগে আছে বুকে
২ বাদ দিলে বছর হিসেবে প্রায় ৪৩
তবু, আব্বা আপনি কি জানেন
অভিমান কেন সরে না এখনো?

আর কী ছিল বুকে জড়িয়ে ধরা ছাড়া ভালবাসার
বাজারে গিয়ে লুকিয়ে পরোটা মিষ্টি আর
নিজের ভাগের মাংসের টুকরা পাতে তুলে দেয়া ছাড়া
তবু শরীর শক্ত করে থেকেছি, পাত থেকে ছুঁড়ে ফেলেছি
মাংসকিসের অভিমানে? আপনি কি জানেন

আপনি আলো হাতে হাঁটুপানিতে হাঁটেন, প্লাবন কি এসেই গ্যালো??
আমি অন্ধকারের পিছু পিছু, আম্মা তোমার ঘুম কি হলো?

ঘুম হয় না, কারো ঘুম নাই, নাই নিদান সর্বগ্রাসী মাতমের
আবার বাঁধে ঘর, প্রেমিক প্রবর, এইরকমই সন্তরণ জীবনের
তবু আমার কেন রয়, জন্মগন্ধের ভয়, নীলকণ্ঠ কেন অভিমানে

আপনি কি জানেন?

১৩.১০.২০১৮

Tuesday, October 9, 2018

সুখই বটে!


অতঃপর সরকারি চাকুরে থাকার শেষ সময়ে এসে
অর্থকড়ির লাম্পট্য ক্লান্ত হলে তিনি একা হলেন।
স্ত্রী-সন্তানদের উপর বিরক্তি তাঁর অনিবার্যই ছিল
সে রাস্তা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তিনি আগেই ঢালাই
করে রেখেছিলেন। ফলত অভব্য মানুষজনের কপালে
রাস্তায় হাঁটতে না পারার দোষারোপ অনিবার্যই ছিল।

তাঁর একাকীত্ব লাঘবের নিমিত্তে, আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে
স্ব-ধর্মমতে তিনি আরেকটা বিবাহ করিলেন, তখন তাঁর বিবিধ
হুমকিগুলো টাকার নোটের কড়কড়ে শব্দ বলে মনে হচ্ছিল।
তিনি যখন নিকট-উনাত্মীয়দের ডেকে বলতে লাগলেন, ‘দেখে যাও-
আমি কতটা সুখে আছি’, তখন আমরা বুঝিলাম
অহিসেবি-অনর্থকে মুড়িয়ে মুড়িয়ে নারীর যৌনাঙ্গে
প্রবেশ করানোর নামই সুখ।

০৯.১০.২০১৮

Thursday, September 27, 2018

চল পুড়ি, পুড়ে ভস্ম হই


নত হই, চল নামি অতলে
তোমার ওষ্ঠাধরে দাউ দাউ আগুন
চল পুড়ি, পুড়ে ভস্ম হই

চল কবিতা লিখি আর জাহান্নামে নেই পৃথিবীকে
ভস্মস্তূপে যদি দেখা পেয়ে যাই পবিত্র ঈশ্বর!!

২৭.০৯.২০১৮

পুরোনো বেদনা


তেমন করে কিছু মনে পড়ে না
পুরোনো বেদনা টুথব্রাশে লাগিয়ে কিছু পরেই কুলি করে ফেলি
ইদানিং তুমি প্রায়ই আমার আশপাশে হাঁট, ভুলে ধাক্কা লেগে
গেলে কী তুমি সরি বলবে না আমি?
তোমার হাসি কিন্তু বেশ কৌতুকময়...কি বল? আমার গাম্ভীর্যও
আমার গাম্ভীর্যে নোনা ইলিশের স্বাদ, তুমি এইমাত্র গাড়ি থেকে
নেমে বুকের বামপাশটা ঠিকঠাক করতে করতে উঠে যাচ্ছ, শোনো
এতোটা হ্যাংলা ছিলাম না কিন্তু আমি, ইদানিং কিছুটা হয়েছি বটে
আজকাল অবহেলা অতটা নিতে পারি না। বয়স হচ্ছে
সেদিন দোতালার ল্যন্ডিয়ে কেমন আছ বলতে বলতে তোমাকে
পেরিয়ে একলাফে দুটো সিঁড়ি পার হয়ে গেলাম, সেগুলো সিঁড়ি না
অবহেলা ছিল। তুমি নিশ্চয় বোঝনি। তোমার মাথার উপর জমা রাখা
রোদ চশমা অন্তত তাই বলে। ওহ...তোমাকে তো বলা হয়নি
সেদিন কিন্তু তোমাকে বেশ লাগছিল।

বেশ মানে সুন্দর
বাগান খুব একটা চোখে পড়ে না বলে, বলা চলে
১২ তলার টবে ফুটে থাকা গোলাপ। জানো তো
কাঁটার ভয়ে আমি সচরাচর গোলাপে হাত লাগাই না

১৯.০৯.২০১

Wednesday, August 29, 2018

কেবল আমি হইলাম না


আজকে ঠিকঠাক ভোর হইল, কেবল আমি হইলাম না

একটা সরল সোজাসাপটা রোদ আমাকে পার হইয়া আমার চেয়ার দখলে লইল। পাশের টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকের বাড়ির লনে কুত্তাগুলা আগের তুলনায় বেশি ঘেউ ঘেউ করিল। পৃথিবী তার খোলস পাল্টানোর আশায় এক দঙ্গল দেবশিশু রাস্তায় নামিয়ে হোলিখেলার আয়োজন করল। বলাই বাহুল্য রক্তের রঙ লাল, তাকে সবুজে পরিণত করার চেষ্টার পরিনতি অন্ধকার।
আমি অন্ধকার হাতড়ে একটা হিজল গাছের তলায় মানুষের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু  কীট, মানুষ, পতঙ্গ, পাখি কিংবা পশু কাউকেই আলাদা করতে পারি না, এমনকি তারাও আমাকে একইরকম অবহেলায় ফেলে যাচ্ছে।
একটা মোহময়ী হিজল গাছের মোহে আমি আটকা পড়ে আছি আধো অন্ধকারে

প্রতিদিন ঠিকঠাক ভোর হয়। কেবল আমি হই না
পৃথিবীর নির্লজ্জ পাটাতনে আমারই মাথা কেবল কেবল হেঁট হয়ে থাকে

ও জল, আমার শুশ্রূষা চাই

২৯.০৮.২০১৮

Sunday, August 19, 2018

বাসতে বাসতে বাসি করে ফেলি


তোমাকেই বাসি। বাসতে বাসতে বাসি করে ফেলি। তবু তোমাকেই বাসি। তোমাতেই যাই, যাইতে যাইতে আর কোথাও যাওয়ার নাই। তবু তোমাতেই যাই। তোমাকেই খাই, খাইতে খাইতে কিছু বাকি রাখি নাই, তবু তোমাকেই চাই। চাইতে চাইতে, অকস্মাৎ পথের ঘাসফুল বনে যাই, পদচুম্বনে গলে যদিওবা যাই তবু তোমাকে পাই, বারে বারে পাই, মনে ভয় নাজানি হারাই।

শুধু তোমাতেই বাসি, বাসতে বাসতে বাসি করে ফেলি

১২.০৮.২০১৮

সর্বশান্ত কবিতা

কী যে কথা ছিল কিছুই মনে পড়েনা
কিংবা কিছুই ছিল না কথা, ভোর
তার নিয়মেই ভোর। হঠাৎ কী যেন
কী যেন দুলতে থাকলে মনে
লিখে রাখি সর্বশান্ত কবিতাদের তোর।

তবে কী হয়? সারে কি জীবনের ক্ষত?
একলা হাওয়ায় উড়ে নির্বাক রঙধনু যত
গড়াতে গড়াতে জড়িয়ে গেলে
তাড়াতে তাড়াতে ছাড়াতে হয়
চলতে চলতে ছিটকে পড়া, এইসব অপার বিস্ময়!

দৃশ্যরা হেঁটে যায়, মানুষেরা স্থির
জীবন কাটিয়া যায়, জীবন অধীর

১৬.০৮.১৮


Wednesday, July 25, 2018

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বৃষ্টি


অনেকদিন পর সেদিন বিকেলে বৃষ্টি এল
অনেকদিন পর সেদিন শুক্রবার বিকেলে
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বৃষ্টি এল।
হৃৎপিণ্ড লাফাতে লাফাতে কণ্ঠনালি ঠেলে বের
হওয়ার আগে তাকে কোনোমতে ঠেকানো গেল
তারপর স্মৃতিরা ভিজলো। শূন্যতার কালিতে
লেখা একটা সাদা চিঠি নৌকা হয়ে ভাসলো

হারানো কতগুলো বছর, একটা শৈশব
আর কতগুলো শরৎকাল ভিজলো
স্কুলপথে দাঁড়িয়ে থাকা জামগাছটা ভিজলো
কার্নিশে লুকানো একটা বোকা কাক ভিজলো

ভিজতে ভিজতে ভাসতে ভাসতে
প্রায় দাঁড়িয়ে যাওয়া একটা জীবন ধ্বসে গেল জলে
রুপালি মাছেরা তখনো স্বপ্ন দেখে, কানাকানি করে
জলের অতলে

২৬.০৭.২০১৮

Saturday, July 14, 2018

একটি কবিতার ধ্বংসাবশেষ


আমি যেখানে রোজ হাঁটি, তার পাশেই ধ্বংসাবশেষ নিয়ে হাঁটে একটা পৃথিবীও
আমি তার পোড়া গন্ধ নিতে নিতে হাঁটি, অবশেষগুলো উল্টে পাল্টে দেখি।
দেখি একজন যৌন(জন শব্দটি আমার কেবল যৌন যৌন মনে হয়)প্রিয় কবির সতেজ হাড়কে আখ ভেবে চর্বন শেষে চুষছেন একজন রাজনীতিকপাশে দাঁড়িয়ে নমিতমস্তক কবি উদ্গীরণ করছেন ততোধিক রসদেখি একজন জন(জন শব্দটি আমার কেবল যৌন যৌন মনে হয়)প্রিয় নায়িকার অবশেষ হিশেবে বেঁচে আছে কেবল তাঁর সিলিকন স্তনবাকি প্রত্যঙ্গগুলো থেকেও সংরক্ষণ রস নিঃসৃত হয় বিধায় আমার সেদিকে যেতে প্রবৃত্তি হয় না।
প্রিয়(প্রিয় বললে আমার কেবল জনপ্রিয় মনে হয়) লেখক বন্ধুর চারপাশে মৌ মৌ করে বডি স্প্রে’র গন্ধ যদিও শব্দ আর অক্ষর পচে বের হচ্ছে পুঁজ। আমার প্রিয়((প্রিয় বললে আমার কেবল জনপ্রিয় মনে হয়) বন্ধুর স্ত্রীর জীবন যাপন সংক্রান্ত হা-হুতাশে তরতাজা লাফানো মাছগুলো কেমন বোবা চোখে তাকিয়ে থাকে। জনৈক বুদ্ধি বিক্রেতার উৎফুল্ল মগজে মুকুটের মত লেপ্টে আছে কোলাহলপ্রিয় কাকের বিষ্ঠা। বলাই বাহুল্য মগজের হাটে ফেসবুক মূল্যে বিক্রি হচ্ছে তাবৎ মেধাবীদের মগজ।
সভ্যতা নামক যে অ্যাম্ফিথিয়েটারে দিনরাত প্রদর্শিত হচ্ছে নাটক, সে নাটকের আমিও একজন কুশীলব। সুতরাং ডিরেক্টরের নির্দেশনা ব্যতীত আমিও চিন্তারহিত। শুধু আমার একান্ত ব্যক্তিগত হাঁটার সময়গুলোতে আমার অলস মগজে পায়চারি করে কিছু কবিতার ধ্বংসাবশেষ, যখন দেখি সভ্যতার আলোকোজ্জ্বল চাতালে অবলীলায় পেচ্ছাব করে যায় আন্দামানের এক জারাওয়া নারী

আর ‘অসভ্য’ ‘অসভ্য’ বলে চিৎকার করতে থাকে।

১৪.০৭.২০১৪


Saturday, July 7, 2018

আম পোকার সৃষ্টি রহস্য


একটা ঠিকঠাক শক্তসামর্থ কাঁচা আমরে সোফার নিচে বিছাইয়া রাখছিলাম পাকার জন্য। আগেই বইলা রাখি কোথাও কোনো খুঁত ছিল না আমটার। তো কয়দিন পরে আম খাইতে গিয়া এর ভিতর থাইক্কা পোকা বের হইল। আমি অবাক, যদিও অবাক হওয়ার ক্ষমতা আমার নাই বইলা মনে করছিলাম। একদিন বেবিট্যাক্সিতে তাজমহল রোড পার হইতে হইতে আমার অবাক হওয়ার ক্ষমতা, বিশ্বাস করার ক্ষমতা শেষ হইয়া গেছিল। এমনই ভাবতেছিলাম এতদিন। আজকে অবাক হইয়া সেই বিশ্বাসও ভাইঙ্গা গেছিল প্রায়।
যাই হউক, এইরকম একটা অক্ষতযোনি আম থাইকা পোকা পাইয়া আমি মনে মনে ইউরেকা ইউরেকা বইলা চিল্লাইয়া উঠলাম। ভাবলাম আমি বুঝি প্রানিকূলের সৃষ্টিরহস্য উদ্ধার কইরা ফেলছি। সেইকরম জম্পেশ একটা পোস্ট দিমু ভাবতেছিলাম ফেইসবুকে। সেইমত গুগল করতে গিয়া আমি পুরাই হতাশ।
বলে কিনা মুকুল হওয়ার কালেই আমে পোকার বীজ ঢুইকা পরে। কেন যে জানতে গেলাম!!

না জাইন্না আমি তো ঈশ্বর হইয়া যাইতেছিলাম প্রায়

০৩.০৭.২০১৮


Saturday, June 9, 2018

রাত বাড়লেই অচেনা হয়ে যায় হলুদ সন্ধ্যা


আমাদের চিনে বাদামের বিকেলগুলো আনমনে জড়িয়ে রাখত
সন্ধ্যার শরীর। সন্ধ্যাগুলো লেপ্টে থাকত সবুজ ঘাসে

সন্ধ্যা এমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল
আমাদের শৈশবের হলুদাভ বসবাসে

যদিও সন্ধ্যা মানে চাপকলের শব্দ, মুখস্তের কলকল
তবু সন্ধ্যা মানে তোমাকে ছুঁয়ে দেখার ছল
সন্ধ্যা মানে কবিতায় হাঁটাহাঁটি, জোছনায় ডুবাডুবি
শিশিরের জল। সন্ধ্যা মানেই চাঁদের দেশে তুমি অবিকল

তোমার এসবের কিছুই মনে নেই, শুনেছি
তুমি এখন ভীষণ প্রেমময়, মৃত্যুর সমান বয়সী জীবন নিয়ে
কারো সংগোপন আশ্রয়। তুমি ঠিকই জানতে
এইসব শিশিরের শব্দ জোছনা সাঁতার অর্থহীন, বন্ধ্যা

রাত বাড়লেই অচেনা হয়ে যায় হলুদ সন্ধ্যা

১০.০৬.২০১৮

Monday, June 4, 2018

মাছ

এই প্রথম একটা মাছকে দেখে আমার হিংসা হল
                
ঘটনাটা খুলেই বলি তবে
একটা ছোটখাট পিচ্চি মাছ, হলোই না হয় সুন্দর
তুলতুলে, আরাম আরাম। নাহয় চাইলেই আপনি
হাড়শুদ্ধ চিবিয়ে খেতে পারেন আয়েশে

তাই বলে এইরকম মৃত একটা মাংসপিণ্ডের এত ঔদ্ধত্য?
আপনি যাকে প্রেমবশে ঠেসে রাখলেন শীতযন্ত্রে
সময় হলেই উল্লাসে মাতবেন ভোজতন্ত্রে
সে কিনা পুরো শীত-তন্ত্রকে অবজ্ঞা জানিয়ে
আপনাকে হতাশায় ভাসিয়ে
সামিল হল পচন তন্ত্রে?
কী দুঃসাহস! ভাবা যায়?

আর এদিকে আপনি একটা মেনিমুখো লাশ
দেশ জুড়ে রক্তস্রোতে ভাসতে থাকা সতেজ মাছ

০৪.০৬.২০১৮

Thursday, May 31, 2018

অনুকবিতা


১।
নিশীথে একলা চাঁদ কুয়াশা চাদরে হাঁটে
আর বাঁশী বাজে, বাঁশী বাজে...

‘আজ রাতে ননদিনী থাকবে পাহারায়
আমি বলতে ভুলে গেছি সে যেন বাঁশী না বাজায়’

২।
এ কিযে ভয়ংকর ঘোর
আমি তোর, কেবলি তোর

০১.০৬.২০১৮

Friday, May 25, 2018

‘চমৎকার!— ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার -’


(চলমান মাদকবিরোধি অভিযানের প্রতিক্রিয়ার)

বিশুদ্ধিকরণের  জন্যে আঁজলা করে আপনি যে জল তুলছেন
তাতে আমরা আপ্লুত, ততোধিক আপ্লুত যে
আঙ্গুলের ফাঁক গলে নর্দমাটা শেষমেশ অবিকৃতই থেকে যাচ্ছে

অপ্রবেশ্য অন্ধকারে আপনি ঢুকতে পারবেন না জেনেই
আপনার রাইফেল তাক করেছেন। আমরা অন্ধকারের পূজারী
গুলির ফুটায় প্রবেশের জন্য আমাদের শিশ্ন যারপরনাই উত্তুঙ্গ

আপনার এই অভাবনীয় দায়িত্ব পালনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে

অতঃপর অন্ধকারকে জড়িয়ে ধরে
আসুন আমরা একটা সঙ্গমক্লান্ত ঘুম দেই


২৫.০৫.২০১৮


শূন্যতা

খুব একটা কিছু নয়
এই রকম হয়
শূন্য থেকে শূন্যে গেলে
শূন্যই জেগে রয়

২৪.০৫.২০১৮